নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদী পৌরসভার সদাসদি এলাকার শত বছরের পুরোনো জমিদার বাড়ি। একসময় জমিদারি ঐতিহ্য, নান্দনিক স্থাপত্য আর কারুকার্যের কারণে যার পরিচিতি ছিল বিস্তৃত এলাকাজুড়ে। এখন সেই জমিদার বাড়িই ধুঁকছে অস্তিত্বের সংকটে। অযত্ন-অবহেলা, দখল, চুরি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি পরিণত হয়েছে জরাজীর্ণ ভবন ও জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দা মালেক মিয়ার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি তদারকি না থাকায় বাড়িটির বিভিন্ন অংশে দখলদারিত্ব তৈরি হয়েছে। ভবনের দরজা-জানালা, লোহার গ্রিলসহ মূল্যবান স্থাপত্য উপকরণও একের পর এক উধাও হয়ে যাচ্ছে। ফলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শনটি ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১০১ কক্ষের জমিদার বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ
স্থানীয় বাসিন্দা হাবিবুর রহমান জানান, সদাসদি জমিদার বাড়িটি ছিল বিশাল আকারের একটি দোতলা স্থাপনা। বাড়িটিতে প্রায় ১০১টি কক্ষ ছিল বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। একসময় জমিদার বাড়ির নান্দনিক কারুকাজ, নকশা করা দরজা-জানালা ও স্থাপত্যশৈলী দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতেন। কিন্তু বর্তমানে ভবনের অধিকাংশ অংশই জরাজীর্ণ। কোথাও দেয়ালে ফাটল, কোথাও ছাদের অংশ ভেঙে পড়েছে। চারপাশে গজিয়ে উঠেছে ঝোপঝাড় ও আগাছা। দীর্ঘদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় পুরো এলাকা অনেকটা পরিত্যক্ত স্থাপনার রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, একসময় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই বাড়ি দেখতে আসতেন। কিন্তু এখন বাড়িটির অবস্থা দেখে মনে হয়, দেখভাল করার কেউ নেই। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অল্প সময়ের মধ্যেই ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।
আরেক বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, বাড়িটির বিভিন্ন অংশে দখল ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে তারা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছেন। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ চান তারা।
বিশাল পুকুর, ভাঙা ঘাট—হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতিচিহ্ন
জমিদার বাড়ির পাশের বিশাল শানবাঁধানো পুকুরটিও এখনো অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। স্থানীয়দের মতে, একসময় পুকুরটির চারপাশে ছিল চারটি ঘাট। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘাটগুলোও ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা বুলবুল মিয়া জানান, পুকুর ও ঘাটগুলোও জমিদার বাড়ির ইতিহাসের অংশ। এগুলো সংস্কার করে সংরক্ষণ করা গেলে পুরো এলাকাটিই একটি ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
মালিকানা নিয়ে বিরোধ, দখলের অভিযোগ
সদাসদি জমিদার বাড়ি নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—বাড়ির মালিকানা দাবি করে একাধিক ব্যক্তি স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ দখলে নিয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাড়িটির মালিকানা ও জমির প্রকৃত স্বত্ব নিয়ে বিরোধ থাকায় প্রশাসনিকভাবে কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে জমির খতিয়ান, দলিল, নামজারি ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।
এছাড়া হারিজুল ইসলাম হারি , মেহেদী হাসান, নামে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জমিদার বাড়ির জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে ব্যাংক ঋণের নথি বা বন্ধকী দলিল প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, এখানে শুধু একটি পুরোনো ভবন ভেঙে পড়ার ঘটনা নয়—এর সঙ্গে জমির মালিকানা, দখল, সম্ভাব্য বন্ধক এবং ঐতিহাসিক সম্পত্তির আইনগত অবস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
কারুকাজ ও মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, বাড়িটির দরজা-জানালা, গ্রিল ও বিভিন্ন স্থাপত্য উপকরণের একটি অংশ ইতোমধ্যে চুরি বা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে জমিদার আমলের স্থাপত্যশৈলীর গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে।
একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ভবনের মূল কাঠামোর পাশাপাশি দরজা, জানালা, লোহার কারুকাজ, অলংকরণ ও অন্যান্য নির্মাণ উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ। এসব উপাদান হারিয়ে গেলে ভবিষ্যতে স্থাপনাটি সংস্কার করলেও এর মূল ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
প্রশ্ন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে
স্থানীয়দের প্রধান প্রশ্ন—এত পুরোনো ও ঐতিহাসিক একটি স্থাপনা ধ্বংসের মুখে থাকলেও এটি সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যকর উদ্যোগ কোথায়?
স্থাপনাটি প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের আওতায় রয়েছে কি না, থাকলে এর বর্তমান আইনগত মর্যাদা কী, কিংবা সংরক্ষণের জন্য কোনো জরিপ বা তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ও এখন









