অবশেষে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৩০ পরিবারের ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ পুনর্বাসন পল্লীর ঘরের দলিল সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ আট বছর অপেক্ষার পর জমির মালিকানার দলিল পাওয়ার পথ খুলে যাওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে পরিবারগুলোর মধ্যে।
২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ পুনর্বাসন পল্লীর ঘর হস্তান্তর করা হলেও এতদিন মালিকানার দলিল বুঝে পাননি তারা। এ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৯ জুলাই ১২১টি পরিবারের দলিল সম্পন্ন হয়। বাকি নয়টি পরিবারের দলিলও আজ ১৩ আগস্ট সম্পন্ন হয়েছে। নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই দলিলগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানা গেছে।
দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এ’ টাইপের ৮২টি পরিবারকে সাড়ে সাত শতক এবং ‘বি’ টাইপের ৪৮টি পরিবারকে পাঁচ দশমিক ৫৫ শতক জমিসহ সেমিপাকা বসতঘর দেওয়া হয়েছে। নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির পক্ষে দলিলে দাতা হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন কোম্পানির সচিব বিমল চন্দ্র রায়।
তবে দলিল সম্পন্ন হলেও পুনর্বাসন পল্লীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের নানা সমস্যা এখনো কাটেনি। ২০১৮ সালের অক্টোবরে ঘরে বসতি স্থাপন শুরু হলেও অধিকাংশ পরিবারের সব সদস্যের থাকার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে অনেক ঘর জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। পলেস্তারা খসে পড়ছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে। মশার উপদ্রবও রয়েছে। গভীর নলকূপগুলোর অধিকাংশই অকেজো। পুকুরের পাড়ও বিভিন্ন স্থানে ভেঙে গেছে।
বাসিন্দারা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অন্তত অর্ধেক বর্তমানে পুনর্বাসন পল্লীতে থাকছেন না। বিশেষ করে জেলে ও কৃষক পরিবারগুলো বসতভিটা, কৃষিজমি ও পেশা হারিয়ে অন্যত্র গিয়ে শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করছেন। ফলে যে ‘স্বপ্নের ঠিকানা’কে ঘিরে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা, সেটিই অনেকের কাছে এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
বি-১৮ নম্বর ঘরের বাসিন্দা জামাল মৃধা জানান, তিন ছেলেকে নিয়ে পাঁচজনের পরিবার কোনোভাবে ওই ঘরে বসবাস করছেন। দাশের হাওলা গ্রামে দুই ভাই ও পাঁচ বোনের প্রায় আট একর কৃষিজমি ছিল তাদের। কৃষিকাজের পাশাপাশি মাছ চাষ ও গবাদিপশু পালন করে বছরে ৮-৯ লাখ টাকা আয় করতেন। ২০১৫ সালে উচ্ছেদের পর পুনর্বাসিত হলেও গত ১২ বছর ধরে তিনি বেকার। বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কোনো কর্মসংস্থান হয়নি বলে অভিযোগ তার।
জামাল মৃধার দাবি, ২০১৫ সালে তাদের এলাকায় প্রতি শতক জমি প্রায় ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতি শতকে ৫ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৮০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে একই জমির দাম কমপক্ষে ৩৩ হাজার টাকা।
এ-৪১ নম্বর ঘরের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা তার ঘরের সামনের কার্নিশ, ভাঙা সিঁড়ি ও উঠে যাওয়া মেঝের পলেস্তারা দেখিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, নিম্নমানের বালু দিয়ে কাজ করায় ঘর ও স্থাপনার বিভিন্ন অংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এ-৪৬ নম্বর ঘরের বাসিন্দা ও টেকনিক্যাল স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান জানায়, হাত দিয়ে ধাক্কা দিলেই দেয়ালের পলেস্তারা উঠে যায়। বৃষ্টির সময় পুনর্বাসন পল্লীর রাস্তায় হাঁটুসমান পানি জমে যায় বলেও অভিযোগ বাসিন্দাদের।
পুনর্বাসন পল্লী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও বাসিন্দা মো. অলিউর রহমান নিপু বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল, তার অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। চারটি দোকানঘর এখনো কাউকে হস্তান্তর করা হয়নি। কাঁচাবাজারও চালু হয়নি। ফলে বর্তমানে এখানকার বাসিন্দারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বাসিন্দাদের দাবি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলেও পুনর্বাসন পল্লীর বাসিন্দাদের লোডশেডিংয়ের মধ্যে রাখা হয়। তারা প্রতি ঘরে অন্তত ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল মওকুফের দাবি জানিয়েছেন।
নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ডিজিএম (ফাইন্যান্স) এবং ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ পল্লীর বাসিন্দাদের জমির মালিকানার দলিল সম্পাদন কমিটির আহ্বায়ক মাহমুদুন নবী জানান, পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ও ক্ষতিগ্রস্তদের আবাসন পল্লীর জন্য একই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। জমির শ্রেণি পরিবর্তনসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে দলিল সম্পাদনে সময় লেগেছে। এখন দলিল সম্পন্ন হয়েছে, পরবর্তী সময়ে তা বাসিন্দাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
উল্লেখ্য, কলাপাড়ার ধানখালী ইউনিয়নের দুটি মৌজায় প্রায় ১৬ একর জমির ওপর পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৩০ পরিবারের জন্য ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ পুনর্বাসন পল্লী নির্মাণ করা হয়। এখানে পাঁচ শতক জমির ওপর ১ হাজার বর্গফুট আয়তনের ৪৮টি এবং আট শতক জমির ওপর ১ হাজার ২০০ বর্গফুট আয়তনের ৮২টি সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।









