বিপদে পড়া বন্যপ্রাণীকে উদ্ধার করে আবারও ফিরিয়ে দেওয়া হয় প্রকৃতির কোলে। লোকালয়ে ঢুকে পড়া সাপ থেকে শুরু করে আহত ও বিপন্ন বিভিন্ন বন্যপ্রাণী—ঝুঁকি উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে উদ্ধারে কাজ করে আসছেন অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালীর একদল স্বেচ্ছাসেবী। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর জীবন রক্ষায় স্বেচ্ছাসেবীদের এই নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতি মিলেছে এবার জাতীয় পর্যায়ে।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের জন্য ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার ২০২৬’-এ সম্মাননা পুরস্কার ও প্রশংসাপত্র পেয়েছে পটুয়াখালীর স্বেচ্ছাসেবী প্রাণিকল্যাণ ও পরিবেশবাদী সংগঠন অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালী।
‘খ’ ক্যাটাগরিতে—বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ (প্রতিষ্ঠান/সংগঠন পর্যায়)—এ সম্মাননা দেওয়া হয় সংগঠনটিকে। অনুষ্ঠানে অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালীর প্রতিনিধি তাহেরানের হাতে প্রশংসাপত্র ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেন বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানমসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
জাতীয় পর্যায়ের এই স্বীকৃতিতে পটুয়াখালীর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বিপদগ্রস্ত বন্যপ্রাণী উদ্ধার, প্রাথমিক পরিচর্যা, নিরাপদে অবমুক্তকরণ এবং বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করে আসছে সংগঠনটি।
বিশেষ করে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বিভিন্ন প্রজাতির সাপ উদ্ধারে সংগঠনটির প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়মিত কার্যক্রম স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হয়েছে। মানুষের মধ্যে সাপ নিয়ে ভয় ও ভুল ধারণা দূর করা, অযথা বন্যপ্রাণী হত্যা বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টি এবং উদ্ধার করা প্রাণীকে উপযুক্ত পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই কাজ করছে সংগঠনটি।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “এই সম্মাননা আমাদের জন্য শুধু একটি পুরস্কার নয়, এটি আমাদের দীর্ঘদিনের কাজের প্রতি জাতীয় স্বীকৃতি এবং একই সঙ্গে নতুন দায়িত্বের অঙ্গীকার। আমাদের প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবী নিজের সময়, শ্রম ও ঝুঁকি নিয়ে বন্যপ্রাণীর জীবন রক্ষায় কাজ করছেন। এই অর্জন তাঁদের সবার।”
তারা আরও বলেন, “বন্যপ্রাণী প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি প্রাণীকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জীবনকে রক্ষা করা নয়, বরং প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে টিকিয়ে রাখা। তাই মানুষের নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ—দুই বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে আমরা কাজ করতে চাই।”
সংগঠনের পক্ষ থেকে এই স্বীকৃতির জন্য মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনের উপদেষ্টামণ্ডলী, বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট, পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন, উপকূলীয় বন বিভাগ, বিভিন্ন উপজেলা প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী, সাংবাদিক, শুভাকাঙ্ক্ষী, সহযোগী সংগঠন এবং পটুয়াখালীর সচেতন নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালীর স্বেচ্ছাসেবীরা মনে করেন, জাতীয় পর্যায়ের এই সম্মাননা তাঁদের কাজের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আমরা এই পুরস্কারকে পথচলার শেষ হিসেবে দেখছি না। বরং এটি আমাদের জন্য নতুন পথচলার শুরু। ভবিষ্যতে আরও বেশি বিপদগ্রস্ত বন্যপ্রাণীকে উদ্ধার করে নিরাপদে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখাই আমাদের লক্ষ্য।”
পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল সংকট ও মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এই উদ্যোগ শুধু প্রাণী উদ্ধারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জাতীয় পর্যায়ের এই সম্মাননা তাই অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালীর জন্য যেমন গর্বের, তেমনি পটুয়াখালীর বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবীদের জন্যও এটি একটি বড় অর্জন।









