চাকরির পেছনে না ছোটা উদ্যোক্তা প্রকৌশলী মোজাহিদুলের সৌদি খেজুরের বাগানে তাণ্ডব, নৃশংসতা
দিন-রাত হার না মানা পরিশ্রমে সফলতার পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন প্রকৌশলী মোজাহিদুল ইসলাম। শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে দৃঢ় মনোবল নিয়ে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে গড়ে তুলেছিলেন সৌদি খেজুরের বাগান। সফলতার মুখও দেখছিলেন। শুরু করেছিলেন বিপণন কার্যক্রম। অসাধ্য সাধন করে যখন সাফল্যের পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন, তখনই তার স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে।
মানুষের মতো দেখতে এক অমানুষ তার বাগানটি তছনছ করে দিয়েছে। কৃষি ফার্মের গেট ভেঙে ফলনধরা ১০টি সৌদি খেজুর গাছ কুপিয়ে নষ্ট করা হয়েছে। বাদ যায়নি আম, লংগান, লেবু, ফলন্ত অন্তত ১০টি কলাগাছ ও মালবেরি গাছ। গাছগুলো মাঝ বরাবর কেটে ফেলা হয়েছে। ছড়াসহ অন্তত তিনটি খেজুরের ছড়া কেটে নেওয়া হয়েছে। যেন পুরো বাগানজুড়ে ধ্বংসের তাণ্ডব চালানো হয়েছে। ক্ষতবিক্ষত গাছগুলো এখন নির্বাক সাক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।
যদিও কলাপাড়া থানা পুলিশ অভিযুক্ত রবিউলকে বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করেছে, কিন্তু মোজাহিদুলের এই অপূরণীয় ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব—সেই প্রশ্ন এখন সবার।
মোজাহিদুলের ভাষ্য, “আমার শরীরে কোপ দিলেও ক্ষত হয়তো একসময় শুকিয়ে যেত। কিন্তু জীবিকার অবলম্বন শেষ করে দেওয়ায় আমার ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার।” তিনি জানান, বাগান কিংবা জমির আশপাশে গেলে তাকেও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
গত ৩০ জুলাই বেলা ১১টার দিকে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পৌরশহরের বাদুরতলী বাঁধঘাট এলাকায় তার জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন এভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ঘটনাটি এখন পুরো কলাপাড়াজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হয়েছিলেন মোজাহিদুল। নিজের মেধা, শ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে যখন স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই তার ওপর নেমে আসে এই ধ্বংসাত্মক আঘাত।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে তিনি সরকারপ্রধানসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের কাছে আকুতি জানিয়েছেন। তিনি সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
গত ৫ আগস্ট তিনি কলাপাড়া থানায় একটি এজাহার দাখিল করেন। সেখানে বাদুরতলী বাঁধঘাট এলাকার ৩২ বছর বয়সী মো. রবিউলকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া রবিউল ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মুচলেকাও দেওয়া হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মোজাহিদুলের কোনো ক্ষতি হলে তার দায় তারা বহন করবেন। তবুও মোজাহিদুলের পক্ষে আবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এজাহারে মোজাহিদুল উল্লেখ করেছেন, তার প্রায় ১৫ লাখ ২৭ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া অভিযুক্ত রবিউল প্রকাশ্যে তাকে খুন-জখমের হুমকি দিয়েছেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মোজাহিদুল জানান, ২০১৮ সালে তিনি সৌদি খেজুরের বাগান করার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২০২২ সাল থেকে গাছে ফল ধরা শুরু হয়। পরে বাগানটি পূর্ণতা পায় এবং তিনি খেজুর বিক্রি শুরু করেন। ২০২৪ সাল থেকে সৌদি খেজুরের চারা বিক্রিও শুরু করেন। স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এই উদ্যোক্তা।
উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ তাকে সফল খামারি হিসেবে সম্মাননা দিয়েছে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি, সাহস ও মনোবলই ছিল তার মূল পুঁজি। কিন্তু তার ফার্মের ওপর নেমে আসা এই মানবসৃষ্ট বিপর্যয় সবকিছু অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সন্তান হারানোর মতো অঝোরে কেঁদে ফেলেন তিনি। এখনও তিনি জানেন না, তার অপরাধ কী ছিল।
মোজাহিদুল জানান, বাদুরতলী বাঁধঘাট এলাকায় দুই ভাই মিলে ২৭ শতক জমিতে এই বাগান গড়ে তোলেন। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৭০টি বড় সৌদি খেজুর গাছ, ২০০টিরও বেশি চারা এবং সৌদি খেজুরসহ বিভিন্ন ফলজ গাছের একটি নার্সারি রয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন জানান, ঘটনার পর তিনি ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তা মোজাহিদুল ইসলামের খামার পরিদর্শন করেছেন। তার ভাষায়, “ঘটনাটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক, অমানবিক এবং এটি স্পষ্টতই ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে।”
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাপাড়া থানার এসআই সুজন চক্রবর্তী জানান, একমাত্র আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।








