কলাপাড়ায় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে কৃষি পেশায় ভয়াবহ সংকট, বেড়েছে বেকারত্ব ও পরিবেশগত বিপর্যয়
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নে স্থাপিত মেগা প্রকল্প কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রেক্ষিতে কৃষি পেশায় ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কৃষিজমি ও উন্মুক্ত জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় এলাকার মানুষ তাঁদের চিরাচরিত স্বাধীন পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে এসব মানুষ কোনো উপায় না পেয়ে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করছেন। তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ধানখালী ইউনিয়নের পরিবেশগত ও আর্থ-সামাজিক জীবনযাত্রার ওপর মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে পরিচালিত গণগবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে।
ওই ইউনিয়নের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত গণগবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত ‘আমাদের মাটি, আমাদের জীবন’ শীর্ষক গণগবেষণা প্রতিবেদনে এই সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজন-এর বাস্তবায়নে প্রকাশিত এই গণগবেষণায় সহায়তা করেছে একশনএইড বাংলাদেশ। গবেষণায় বলা হয়েছে, চিরায়ত স্বাধীন পেশা কৃষিতে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নকৃত এলাকার ৪৫৭ জন উত্তরদাতার ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, ওই এলাকার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ছিল কৃষি।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৬১ জন কৃষক জানিয়েছেন, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তাঁরা কৃষি পেশায় সক্রিয় ও স্বাবলম্বী ছিলেন। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কৃষি পেশায় টিকে আছেন মাত্র ৫১ জন। বাকি ১১০ জন পেশা হারিয়েছেন। ফলে এসব মানুষ তাঁদের আয়ের প্রধান উৎস ও স্বাধীন পেশা কৃষিকাজ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
উত্তরদাতাদের মধ্যে গৃহিণীর সংখ্যা ৯৮ জন থেকে বেড়ে ১৫২ জনে দাঁড়িয়েছে। অথচ যাঁদের সংখ্যা বেড়েছে, তাঁদের অনেকেই আগে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একইভাবে প্রকল্পের আগে উত্তরদাতাদের মধ্যে ৪৯ জন দিনমজুর ছিলেন, যা পরে বেড়ে ৭১ জন হয়েছে। কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারের সংখ্যা ৭ জন থেকে বেড়ে ৩২ জনে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এসব পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতায় ধস নেমেছে এবং সামাজিক সংকটও বেড়েছে। প্রকল্পের আগে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ নিজেদের জীবনযাত্রাকে ভালো বা খুব ভালো বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পর মাত্র ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ মানুষ একই মতামত দিয়েছেন। অন্যদিকে ৭১ দশমিক ৩৩ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁদের জীবনযাত্রা খারাপ বা খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশগত বিপর্যয় ও বহুমাত্রিক ঝুঁকি, সুপেয় পানির সংকট, জলাশয়ের মরণদশা, বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব এবং জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থানের ক্ষয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়েছে বলেও মতামত দেওয়া হয়েছে।
মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ধানখালীর নদী ও খালে ইলিশসহ ৩০টিরও বেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে এসব মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য সংকট, বিভিন্ন রোগবালাই এবং নারীদের ওপর লিঙ্গভিত্তিক প্রভাবের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকায় এই গণগবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণাটিকে জীবনমুখী পর্যবেক্ষণের ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ধানখালী ইউনিয়নের ৮টি ওয়ার্ডের প্রথম পর্যায়ে ৪৫৭টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৯৬টি পরিবারের ওপর বিস্তারিত সামাজিক ও পরিবেশগত জরিপ পরিচালনা করা হয়। এছাড়া উঠান বৈঠক ও মূল তথ্যদাতাদের সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়।
সোমবার দুপুরে কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন ‘পায়রা’-য় অনুষ্ঠিত গণগবেষণার ফলাফল বিষয়ক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কলাপাড়া পরিবেশ ও জনসুরক্ষা মঞ্চের কার্যনির্বাহী সদস্য মেজবাহউদ্দিন মান্নান। প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. টেনমং, উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মোকসেদুল আলম, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ আরিফুর রহমান, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আখতার এবং কলাপাড়া থানার এসআই আব্দুল হামিদ।
এছাড়া বক্তব্য রাখেন গণগবেষক মেহেদী হাসান ও হালিমা আয়েশা। গবেষণার ওপর পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনা করেন একশনএইড বাংলাদেশের অ্যাসোসিয়েট প্রোগ্রাম অফিসার মারজিয়া জাহান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রান্তজনের মাঠ সমন্বয়কারী সাইফুল্লাহ মাহমুদ।
অনুষ্ঠানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ, সরকারি কর্মকর্তা, গণগবেষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
উল্লেখ্য, কলাপাড়ার ধানখালীতে ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা (বিসিপিসিএল) এবং একই উৎপাদন ক্ষমতার পটুয়াখালী (আরএনপিএল)—এই দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে সচল রয়েছে। এছাড়া আরও একটি আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।
এসব জমি অধিগ্রহণের ফলে সরাসরি অন্তত ৬৮৫টি পরিবার গৃহহারা ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এছাড়া পরোক্ষভাবে অন্তত দেড় হাজার কৃষক ও জেলে পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বর্তমানে প্রকল্প এলাকার মানুষ তাঁদের এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার দাবিতে সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা সরকার এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন।









