বর্ষার মৌসুমে পায়রা নদী বা ছোট খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন ফোরকান-
রেহেনা এই দম্পতির। আর শীতের মৌসুমে উপজেলা পরিষদের পাশে ছোট্ট একটি টং
দোকানে এই দম্পতি শীতের পিঠা বিক্রি করেন। আর সব মৎস্যজীবীর মতো তাদেরও
নিত্যসঙ্গী অভাব-অনটন। জীবন-জীবিকার তাদের এই চিত্র ফুটে ওঠে। ফুটে ওঠে তাদের
বিচিত্র সংগ্রাম। এই দম্পতি হলো পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব সুবিদখালী
গ্রামের মহারাজ বাড়ির ফোরকান মহারাজ ও তার স্ত্রী মোসাঃ রেহেনা পারভীন। কিন্তু তাদের
নেই কোন সন্তানাধি। তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে পায়রা নদীতে মাছ আহরন করেন এবং
সুবিদখালী বাজার কিংবা স্থানীয়দের কাছে মাছ বিক্রি করেন। বিয়ের পর ভাগ্য
পরিবর্তনের আশা ছিলো রেহোনার কিন্তু তা হয়নি। বয়সের ভারের কারণে তারা নদীতে মাছ
ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে তাদের মাছ বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে যেতে হয়না
তেমন। অনেকেই নদীর পাড়ে বসে থাকে উন্মুক্ত বাতাসে আর ঘাটে মাছের ণৌকা
আসলেই দরদাম করে মাছ কিনে নিয়ে যান ক্রেতারা। সরেজমিনে পায়রা নদীর গোলখালী
স্লুইসগেট গিয়ে কথা হয় এই দম্পতিদের সঙ্গে। স্বামী ফোরকান মহারাজ জানান,
আমাদের সংসারে কোন সন্তান নেই আর। আয়ের একমাত্র লোক আমরাই। তাই দু’জনের
খেতে তো হবে। রোদ-ঝড় উপেক্ষা করে বসে নদীতে মাছ আহরন করছেন। মাছ না উঠলে
অনেক সময়ে না খেয়ে থাকতে হবে। আরো বলেন,পায়রা নদীর পূর্ব সুবিদখালী এলাকা
থেকে গোলখালী-চরখালী এলাকার আশপাশের নদীতে মাছ ধরেন। চিংড়ি,
টেংরা,পোয়া,তাপসি,পাঙাশ ধরা পড়ে তাদের জালে। তবে নদীতে এখন আর আগের মতো
মাছ পাওয়া যায়না। ১-২ কেজি পাওয়া যায়। কোনদিন বেশিও হয় আবার কোনদিন শূন্য
হাতে ফিরতে হয়। মাছ বিক্রির জন্য আমাদের বাজারে যেতে হয়না। পায়রা নদীর পাড়ে
গোলখালী স্লুলিসগেটে অনেকেই এখানে ঘুরতে আসেন প্রতিদিন।সাহেবরা মাছ
দরদাম করে ক্রয় করে নেন। আমিও একটু কমমূল্যে দিয়ে দেই। বাজারে যেতেও হয়না আবার
বাজারে গেলে খাজনাও দিতে হয়। প্রতি কেজি মাছ বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায়।
কোনো কোনো দিন তাদের নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়। এভাবেই বছরের পর বছর চলছে
ফোরকান রেহেনা দম্পতির জীবন সংসার। স্ত্রী মোসাঃ রেহেনা বেগম বলেন, শুকনো
মৌসুমে “মাছ ধরা ছাড়া আর অন্য উপায় নেই। আর শীত মৌসুমে উপজেলা পরিষদের
পাশের বসে পিঠা বিক্রি করি। আমাদের কোন সন্তান নেই। এই বয়সে কাজ করতে না
পেরে নদীতে স্বামীর সাথে মাছ ধরছি। এই বর্ষ মৌসুমে মাছের ণৌকায় আমাদের
সংসার। কখনো হাত, কখনো বড়শি আবার কখনো জাল দিয়ে মাছ ধরি। এভাবে দিনরাত
পরিশ্রম করে জীবন পার করছি।তিনি ”আরো বলেন, সরকারি ভাবে জেলেদের তালিকার চাল
পাচ্ছি। স্বামীর সাথে নদীতে মাছ ধরে প্রথম প্রথম লজ্জা পেতাম। কিন্তু উপায় না থাকায়
লাজ-লজ্জা ভুলে মাছ ধরাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি। মাছ ধরতে পারলে খেতে পারি,
না পারলে অনাহারে থাকতে হয়। তাই মানুষ কী ভাবছে তা বিবেচনায় নেওয়ার কথা ভাবি
নাই। নদীতে এখন আর আগের মতো মাছ নেই। প্রতিদিনই অনেক জেলেই শূণ্য হাতে
ফিরছে তীরে। আমাদের মতো আরও অনেক জেলে পরিবারের-ই একই দুর্বিষহ অবস্থা।” পায়রা
নদীর পাড়ে ঘুরতে আসা ঝাটিবুনিয়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ
আবদুল গাফফার বলেন, পায়রা নদীর পাড়ে উন্মুক্ত বাতাসে অনেকেই এখাণে ঘুরতে
আসেন। আমিও আমার মেয়েকে নিয়ে এসেছি নদীর পাড়ে ঘুরতে। আর দেখলাম এক জেলে
দম্পতি মাছ আহরন করে তীরে আসছেন। দু’জন ত্রেতা তাদের কাছ থেকে মাছ ক্রয় করে
নিয়েছে। তারাও এখানে ঘুরতে এসেছেণ। মাছগুলো আমারও ক্রয়য়ের ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু
তারা আগে বলেছে তাই আর সাহস করেনি। তবে জেলে দম্পতি বেশ কমমূল্যেই মাছগুলো
বিক্রি করেছেন। তারা যে সাহস করে নদীতে মাছ আহরন করছেন তা দেখে প্রথমে অবাক
হলেও: এটাই জীবন সংগ্রাম।








