পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার সদর এলাকার সূর্যসন্তান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত শহীদ জিহাদ হোসেনের (২৫) মৃত্যু আজও ভুলতে পারেনি তার পরিবার। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও রক্তমাখা জামাটি যেন বাবা-মায়ের কাছে এক জীবন্ত স্মৃতি হয়ে আছে। সন্তানের হত্যার বিচার না হওয়ায় আজও শোক আর অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তারা।
জিহাদ উপজেলার সদর এলাকার নুরুল আমিন মোল্লা (৫৯) ও শাহিনুর বেগমের (৫৪) ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ঢাকার কোনাপাড়ায় ভাড়া বাসায় থেকে সরকারি কবি নজরুল কলেজের ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত ছিলেন।
ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে এখনও কান্নায় ভেঙে পড়েন মা শাহিনুর বেগম। তিনি বলেন, “বাবা জিহাদ, মৃত্যুর সময় তুমি কত কষ্ট পেয়েছিলে! আমাকে ‘মা’ বলে ডাকছিলে, অথচ আমি তোমার কাছে যেতে পারিনি।”
অন্যদিকে ছেলেকে হারানোর শোকে প্রায় বাকরুদ্ধ বাবা নুরুল আমিন মোল্লা। বড় ভাই জিন্নাত হোসেন এবং দুই বোন জান্নাতুল ও জয়নবও এখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি। পরিবারের সবার স্বপ্ন ছিল জিহাদকে ঘিরে। সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে যায় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই।
যেভাবে নিহত হন জিহাদ
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে দনিয়া কলেজ ও কাজলা ফুটওভার ব্রিজের মাঝামাঝি সড়কে বুকে গুলিবিদ্ধ হন জিহাদ। সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় সালমান হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেদিনই বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তিনি মারা যান।
পরদিন ২০ জুলাই ময়নাতদন্ত শেষে রাতে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পরদিন ২১ জুলাই জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন
জিহাদ দশমিনা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে এসএসসি এবং ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে সরকারি কবি নজরুল কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন।
পরিবারের একটাই দাবি—বিচার
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা নুরুল আমিন মোল্লা বলেন,
“আমার ছেলে মেধাবী ছাত্র ছিল। কীভাবে সব শেষ হয়ে গেল জানি না। যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই।”
মা শাহিনুর বেগম বলেন,
“আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।”
বড় বোন জান্নাতুল বলেন,
“দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গিয়ে আমার ছোট ভাই জীবন দিয়েছে। আমরা তার হত্যার বিচার চাই।”
বড় ভাই জিন্নাত হোসেন বলেন,
“১৯ জুলাই বিকেলে জিহাদ আমাকে ফোন করে শুধু বলেছিল—’ভাই, আমার বুকে গুলি লেগেছে। বাবা-মাকে কিছু বলো না, বাঁচলে দেখা হবে।’ এটাই ছিল ওর সঙ্গে আমার শেষ কথা। আমার ভাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে। আমরা শুধু তার হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।”









