প্রতিদিন না খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে একদিনে মরে যাওয়া ভালো। যদি অবৈধ ট্রলিং বন্ধ করতে না পারেন, তাহলে আমাদের উপকূলের হাজার হাজার জেলেকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলুন।”
বঙ্গোপসাগরে অবৈধ ট্রলিং বোট, বটম ট্রলিং এবং নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালের মাধ্যমে নির্বিচারে মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের প্রতিবাদে চরম হতাশা ও ক্ষোভ থেকে এমন হৃদয়বিদারক আর্তনাদ জানিয়েছেন কলাপাড়া উপকূলের সাধারণ জেলেরা।
রোববার (৫ জুলাই) সকাল ১১টায় মহিপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কলাপাড়া ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম মৃধা এবং সাধারণ জেলে কামাল মাঝি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ সময় তারা উপকূলীয় জেলেদের পক্ষে অবৈধ ট্রলিং বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, কুয়াকাটা, মহিপুর, আলিপুর ও আশাখালী উপকূলসংলগ্ন অগভীর বঙ্গোপসাগরে দিন দিন বেড়ে চলেছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অবৈধ ট্রলিং বোটের দৌরাত্ম্য। এসব বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস (GPS), রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিন ব্যবহার করে সাগরের তলদেশ চষে মাছ শিকার করা হচ্ছে। এর ফলে কোটি কোটি মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ, চিংড়ির রেণু ও কাঁকড়ার বাচ্চা নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে।
জেলেদের দাবি, ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাধারণ কাঠের ট্রলারকে অবৈধ ট্রলিং বোটে রূপান্তর করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের সামুদ্রিক মাছের প্রজনন রক্ষায় ঘোষিত ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার সুফলও এ কারণে ভেস্তে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বছরের পর বছর মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও প্রশাসনের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা যেন “কাঠের চশমা” পরে আছেন। চোখের সামনে অবৈধ ট্রলিং চললেও রহস্যজনক কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
ভুক্তভোগী জেলে কামাল মাঝি বলেন, “আমরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে সাগরে যাই, কিন্তু মাছ পাই না। প্রশাসন চাইলে একদিনেই অবৈধ ট্রলিং বন্ধ করতে পারে। কিন্তু তা হচ্ছে না। ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।”
মাছের তীব্র সংকটের কারণে উপকূলীয় জেলে পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা এখন চরম সংকটে পড়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় অনেক জেলে এনজিও ও মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবিকার তাগিদে অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজের সন্ধানে ছুটছেন। ফলে উপকূলের হাজারো পরিবারে খাদ্য, চিকিৎসা ও সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় নির্বাহ করাও এখন দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
জেলেরা আরও বলেন, দেশের প্রাণিজ আমিষের একটি বড় অংশ আসে সামুদ্রিক মাছ থেকে। অবৈধ ট্রলিং ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে শুধু জেলেদের জীবনই নয়, দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতিও বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে মৎস্যসম্পদ রক্ষা ও সাধারণ জেলেদের বাঁচাতে পাঁচ দফা জরুরি দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—
১. অবৈধ ট্রলিং বোট অবিলম্বে জব্দ ও ধ্বংস করতে হবে।
২. অগভীর সমুদ্রে বটম ট্রলিং সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
৩. বেহুন্দি ও অন্যান্য নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত কঠোর অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
৪. ট্রলিং সিন্ডিকেটের অর্থদাতা ও প্রভাবশালীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. সাধারণ জেলেদের জন্য সাগরে নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও টেকসই মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রলার মালিক ও জেলে প্রতিনিধি হারুন খান, আল-আমিন কাডারু, নুরুল ইসলাম, সিদ্দিক ফকির, রুবেল বয়াতি, কামাল কাডারু, সেলিম আকনসহ অর্ধশতাধিক জেলে ও ট্রলার মালিক উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা উপসহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহসিন বলেন, “বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে জরুরি সভা করে অবৈধ ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”









