▪️বছরে প্রায় ১০ শতাংশ কম পাঠদান
▪️ছয় মাস বন্ধ থাকে খেলাধুলা ও পিটি
পটুয়াখালীঃ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সমান শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু পটুয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী শেরেবাংলা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সেই পরিবেশ বছরের পর বছর ব্যাহত হচ্ছে জলাবদ্ধতা ও জরাজীর্ণ ভবনের কারণে। এর ফলে শুধু অবকাঠামোগত সংকটই নয়, নিয়মিত পাঠদান, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকেও পিছিয়ে পড়ছে।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৮৫৭ জন শিক্ষার্থী এবং ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। পাঁচটি ভবন থাকলেও অধিকাংশই বহু পুরোনো এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে একটি একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়। এরপর প্রায় ২৯ বছরেও নতুন কোনো ভবন নির্মাণ হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে বড় বড় ফাটল, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং বারান্দার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত। সামান্য বৃষ্টিতেই বিদ্যালয়ের মাঠ, চলাচলের পথ ও শ্রেণিকক্ষের সামনের অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় কয়েকদিন ধরে পানি জমে থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের পানি মাড়িয়ে শ্রেণিকক্ষে যেতে হয়। অনেক সময় সাপ, বিচ্ছু ও অন্যান্য বিষধর প্রাণীর আতঙ্কও তৈরি হয়।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর অন্তত তিন থেকে চার দিন বিদ্যালয় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়। এছাড়া বর্ষা মৌসুমজুড়ে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ায় অন্যান্য বিদ্যালয়ের তুলনায় বছরে প্রায় ১০ শতাংশ কম পাঠদান হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বাড়তি চাপ নিতে হয়।
জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। জেলার সবচেয়ে বড় বিদ্যালয় মাঠটি বছরের প্রায় ছয় মাস পানির নিচে থাকায় নিয়মিত খেলাধুলা, পিটি, কুচকাওয়াজ, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা শারীরিক সক্ষমতা, নেতৃত্বগুণ, দলগত কাজের অভ্যাস এবং মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাহিমা মিনি জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং নতুন ভবন নির্মাণের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সুপারিশও ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর কয়েকদিন বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয় এবং নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়।
শিক্ষার্থীরা জানায়, বৃষ্টি হলেই মাঠে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। অনেক সময় ভিজে শ্রেণিকক্ষে যেতে হয়। পানি বেশি হলে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘসময় মাঠ পানির নিচে থাকায় খেলাধুলা ও পিটি কার্যক্রমও বন্ধ থাকে।
অভিভাবকরা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে সন্তানদের পাঠাতে তারা সবসময় উদ্বেগে থাকেন। একই সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়ছে। তারা দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি জানান।
পটুয়াখালী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. মনিরুল কবির জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়টি পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়টি সরকারি অনুমোদন ও বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় সংসদ সদস্যের পাঠানো অগ্রাধিকার তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমানে বিদ্যালয়ের সংকট শুধু ভাঙা ভবন বা জলাবদ্ধতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। যখন বছরের পর বছর পাঠঘণ্টা কমে যায়, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকে এবং শিক্ষার্থীরা অনিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করতে বাধ্য হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পুরো প্রজন্মের শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ। তাই দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার এবং স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়রা।





