ভাঙন কবলিত এলাকা হওয়ায় পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা-সংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীতে বালু মহালের ইজারা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন প্রশাসন। সেই ভাঙন কবলিত নদীতে প্রভাবশালী এক বিএনপি নেতার নেতৃত্বে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। নদী থেকেই এসব বালু নৌযানে করে বিক্রি হচ্ছে। মূলত গভীর রাত থেকে দিনভর চলে বালু তোলার কাজ। নির্বিচার বালু তোলার কারণে হুমকিতে পড়েছে ফসলিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবসতি।
বালু তোলার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন বাউফল পৌরসভা বিএনপির সভাপতি মো. হুমায়ুন কবিরের কাছ থেকে তাঁরা ইজারা নিয়ে বালু তুলছেন।
উপজেলা ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির গত ২১ মে তারিখের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সরকারি রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সোহাগ মিলুর ৪ জুনের স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে উপজেলার নিমদী লঞ্চঘাটে ডুবা বালু মহালের ইজারা দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। কিন্তু বাউফল উপজেলা-সংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীর বাউফল অংশের পুরোটাই ভাঙন কবলিত। এ কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বালু মহালের ইজারা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কালাইয়া মোহনা ও চন্দ্রদ্বীপ খেয়াঘাটের দক্ষিণ পাশে চারটি ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার কাজ চলছে। বালু তুলে তা ভাসমান বাল্কে রাখা হয়।
ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার কাজ তদারক করছেন কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে মো. তোফাজ্জল হোসেন নামের এক ব্যক্তি বলেন নদীর বালু মহালের ইজারাদার বাউফল পৌরসভা বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির। তাঁর নির্দেশেই নদী থেকে বালু তুলছেন।
তিনি আরও বলেন,প্রতি ফুট বালু বাবদ ৪০-৫০ পয়সা করে তাঁকে (হুমায়ুন কবির) দিতে হয়। তাঁর বাল্কে ২ হাজার ৫০০ ফুট বালু ধরে।তিনি প্রতিদিন দুই-তিন বাল্ক বালু তোলেন।
মেসার্স নওরোজ শিপিং লাইন্স (এম- ২৫৮৮৮) নামের একটি বাল্ক বালু ভর্তি করে ফিরছেন কয়েকজন। মেসার্স নওরোজ শিপিং লাইন্সের চালক মো. ছিদ্দিক বলেন, তাঁর বাড়ি পটুয়াখালী। বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবিরের মাধ্যমে তেঁতুলিয়া নদীতে বালু তোলেন।
এভাবে নির্বিচারে বালু তোলার কারণে চরওয়াডেলের দক্ষিণ অংশ ও বাতির খাল এলাকার দুই তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়,তেঁতুলিয়া নদীর পশ্চিম পাশে উপজেলা শহর রক্ষা কালাইয়া-বড়ডালিমা-ধানদী-তাঁতেরকাঠী বাধের বড়ডালিমা ও ধানদী অংশের এক কিলোমিটারের বেশি অংশ বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে নিমদী গ্রামের ৭১ নং নিমদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদী থেকে মাত্র ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরে অবস্থান করছে বিদ্যালয়টি। যে কোনো মুহুর্তে নদীতে বিলীন হয়ে যাবে এমন আশংঙ্কায় বিদ্যালয়টির স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য গ্রামটির পশ্চিম সীমানায় দ্বিতল ভবন তৈরি করা হচ্ছে। এর আগে চারবার বিদ্যালয়টি নদীতে বিলীন হয়েছে। চারবার সরিয়ে নতুন ভবন তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়াও ভাঙনের কবলে আছে ধানদী আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ধানদী কামিল মাদ্রাসা, ধানদী বাজার, নাজিরপুর-তাঁতেরকাঠী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, বড় ডালিমা আজাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ভুক্তভোগী মো. ইউনুস চৌধুরী বলেন, তাঁর বাড়ির কয়েকটি পরিবারের ঘরবাড়ি, মসজিদসহ দুইশ একরেরও বেশি ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। যেখানে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ভাঙনরোধ ও নদী শাসনের জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে হাজারো নারী-পুরুষেরা নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। প্রশাসন বাহু মহালের ইজারা বন্ধ রেখেছে। সেখানে বিএনপি নেতার নেতৃত্বে বালু উত্তোলন করায় হাজারো মানুষের ফসলি জমি ও জনবসতি হুমকির মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতা মো. হুমায়ুন কবিরের মুঠোফোনে কল করলে বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তাঁর ছেলে বাউফল পৌরসভা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক মো. ইমাম হোসেন দাবি করেন, গতবছর তাঁরা বালু মহালের ইজারা পান। ওই ইজারার মেয়াদ ৩০জুন পর্যন্ত। সে হিসেবে তাঁরা ৩০ জুন পর্যন্ত তারা বৈধভাবে বালু কাটতে পারবেন।
বাস্তবে ইজারা দেওয়া হয় বাংলা বর্ষের হিসাবে। সে হিসেবে ৩০ চৈত্র (১৩ এপ্রিল) ইজারার মেয়াদ শেষ হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,গত বছর বুড়াগৌরাঙ্গ নদীর ডুবা বালু মহালের ইজারা দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে বুড়াগৌরাঙ্গ নদী বাউফলের মানচিত্রে নেই। এরপরেও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বাউফলের ভাঙন কবলিত তেঁতুলিয়া নদীতে বালু তুলে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে বাউফলের হাজারো মানুষের ফসলিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবসতি।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন,‘ তেঁতুলিয়া নদীর বাউফল অংশের সিংহভাগ ভাঙন কবলিত। আর ভাঙন কবলিত এলাকায় বালু উত্তোলন করা হলে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে সিমেন্ট-পাথরের তৈরি ব্লক দিয়ে বাউফলের ধুলিয়া অংশের ভাঙনরোধ করা হয়েছে। নিমদী, ধানদী, বড়ডালিমা অংশে ভাঙনরোধ করার লক্ষ্যে অস্থায়ীভাবে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে এবং ওইসব এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন,‘ভাঙন কবলিত এলাকা হওয়ায় তেঁতুলিয়া নদীতে বালু মহালের ইজারা দেওয়া হয়নি। যদি কেউ বালু তোলে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’









