ইতিহাসের কিছু মানুষ কেবল তাঁদের সময়কে প্রভাবিত করেন না; তাঁরা হয়ে ওঠেন সময়ের ঊর্ধ্বে এক চলমান প্রেরণা। তাঁদের জীবন, কর্ম ও আদর্শ যুগের পর যুগ মানুষকে পথ দেখায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি কখনোই তাঁর প্রভাবকে ম্লান করতে পারেনি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তাঁর নাম আজও সমানভাবে উচ্চারিত হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অনেক নেতা এসেছেন, যাঁরা একটি সময়ের জন্য আলোচিত হয়েছেন; কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁদের অবদান সময়ের সীমানা অতিক্রম করে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে। শহীদ জিয়া তাঁদেরই একজন। তাঁর শাহাদতের চার দশকেরও বেশি সময় পর আজ যখন আমরা রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নতুন করে ভাবি, তখন তাঁর দর্শন ও নেতৃত্বের কথা অনিবার্যভাবেই সামনে আসে। এ কারণেই বলা যায়, তিনি কেবল অতীতের একটি অধ্যায় নন; তিনি বাংলাদেশের চলমান ইতিহাসের এক জীবন্ত অংশ। তিনি ছিলেন কিংবদন্তী নেতা, আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন আজীবন।
মুক্তিযুদ্ধের সংকটমুহূর্তে সাহসী উচ্চারণ : ১৯৭১ সালের মার্চ ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও অনিশ্চিত সময়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর দমন-পীড়ন এবং জাতির সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-সব মিলিয়ে তখন চারদিকে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল মুক্তিকামী মানুষের জন্য সাহস ও আশার প্রতীক।
তিনি শুধু ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি; পরবর্তীকালে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব, কৌশলগত দক্ষতা ও সাহসিকতা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়িয়েছিল। স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁর অবদান তাঁকে জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের সংগ্রাম। জিয়াউর রহমান সেই চেতনার একজন গুরুত্বপূর্ণ বাহক ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধকে আরও গতিশীল করেছিল।
সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক: এক অনন্য অভিযাত্রা: একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়া সহজ কোনো বিষয় নয়। জিয়াউর রহমান তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে মেধা, সাহস ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর তিনি দ্রুত নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে তাঁর সাহসিকতা তাঁকে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত, তখন তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত কঠিন। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, খাদ্য সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র ছিল এক কঠিন পরীক্ষার মুখে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি একজন সৈনিকের শৃঙ্খলা ও একজন রাষ্ট্রনায়কের দূরদর্শিতা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তববাদিতা। তিনি আবেগের চেয়ে কর্মকে বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে বিশ্বাস করতেন।
‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ’: রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি : জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। তাঁর বহুল আলোচিত উক্তি “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ” শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি ছিল তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি।
তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের কল্যাণই রাজনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত। ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ যদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই দর্শন তাঁকে সাধারণ রাজনৈতিক নেতাদের থেকে আলাদা করেছে। বর্তমান সময়ে যখন রাজনৈতিক বিভাজন, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতা প্রায়শই জাতীয় স্বার্থকে আড়াল করে ফেলে, তখন তাঁর এই দর্শন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে রাজনীতির যে ধারণা তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তা আজও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও গ্রামভিত্তিক উন্নয়নের রূপকার: শহীদ জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলাদেশের শক্তি লুকিয়ে আছে তার গ্রাম, কৃষক ও উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে। তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশ অর্থ গ্রাম।” এই ধারণা থেকেই তিনি উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে স্থান দেন। তাঁর সময়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রায় ১৪ হাজার খাল পুনঃখননের উদ্যোগ দেশের কৃষি ও জলব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, উন্নয়ন কখনো শুধু শহরকেন্দ্রিক হতে পারে না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন গ্রামের মানুষ উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে। তাঁর এই দর্শন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
বহুদলীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রসার: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো বহুদলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিসর বৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে ভূমিকা রাখেন। তাঁর সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও চিন্তার মানুষকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। তিনি মনে করতেন, গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত আছে মতের বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে। গণতন্ত্রের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল বাস্তবভিত্তিক। তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় উন্নয়নকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখতেন। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের বিকাশ: শহীদ জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন তা শিক্ষিত, সচেতন ও মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক গঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। তাই তিনি শিক্ষা খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর সময়ে সর্বপ্রথম শিক্ষাখাতে বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা নীতির উন্নয়নে তাঁর আগ্রহ ছিল সুস্পষ্ট। পাশাপাশি গ্রন্থাগার আন্দোলন ও জ্ঞানচর্চার প্রসারে তাঁর উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মতো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিগুলো জাতীয় সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করেছে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় সংস্কৃতি ছিল জাতীয় পরিচয়ের একটি অপরিহার্য উপাদান।
মানবিক রাষ্ট্র গঠনে স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়ন: একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; মানুষের জীবনমানই উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড। এই উপলব্ধি থেকেই জিয়াউর রহমান স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ক্যানসার চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কার্যক্রম এবং শিশু উন্নয়নমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ তাঁর মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। শিশু একাডেমি, ‘নতুন কুঁড়ি’ এবং শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের প্রতি তাঁর আন্তরিকতার প্রমাণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো মানুষের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে তিনি সেই দায়িত্ব পালনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখেছিলেন।
আত্মমর্যাদাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থ ও আত্মমর্যাদা। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন, যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, কিন্তু নিজের স্বার্থ ও মর্যাদার প্রশ্নে কখনো আপস করবে না। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠার ধারণা তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক শান্তির জন্য তাঁর এই উদ্যোগ পরবর্তীকালে বাস্তব রূপ লাভ করে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, জাতিসংঘে সক্রিয় ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধির প্রচেষ্টাও তাঁর কূটনৈতিক নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য দিক। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ছিল আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক।
নতুন প্রজন্মের কাছে জিয়ার প্রাসঙ্গিকতা: আজকের বাংলাদেশ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রযুক্তির বিস্তার, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের এই সময়ে নতুন প্রজন্মকে শুধু উন্নয়নের স্বপ্ন দেখলেই হবে না; তাদের প্রয়োজন দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম এবং নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ। শহীদ জিয়াউর রহমানের জীবন নতুন প্রজন্মকে সেই শিক্ষাই দেয়। তিনি দেখিয়েছেন—সাহস ছাড়া নেতৃত্ব সম্ভব নয়, আত্মমর্যাদা ছাড়া স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় না এবং কর্ম ছাড়া উন্নয়ন অর্জিত হয় না। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্র গঠনের কাজ কখনো একদিনে শেষ হয় না; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের ভূমিকা রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, জাতীয় আত্মপরিচয় এবং উন্নয়ন অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। সময় বদলাবে, প্রজন্ম বদলাবে, রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জও পরিবর্তিত হবে; কিন্তু সাহস, আত্মমর্যাদা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের যে শিক্ষা তিনি রেখে গেছেন, তা কখনো পুরোনো হবে না। এ কারণেই তিনি কেবল স্মৃতিতে নন, জাতির চেতনায় আজও জীবন্ত অনুপস্থিতিতেও উপস্থিত।
লেখক: অধ্যাপক ড. এস.এম. হেমায়েত জাহান উপাচার্য পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।









