মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: প্রবারণা পূর্ণিমা। রাখাইনদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। আর এই তিঁথিতে বরাবরের মতো এবছরও সোমবার দিনভর বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার রাখাইন জনগোষ্ঠী। অনুষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত আকাশে সন্ধ্যার পরে ফানুস ওড়ানোর উৎসব । প্রত্যেক বছর এ তিঁথিতে প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসব পালিত হয়ে আসছে। উৎসব পালনের জন্য এবছরও কলাপাড়ার ২৮টি রাখাইন পল্লীর বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধবিহার কমিটির কাছে সরকারি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে রাখাইন পল্লীতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
কুয়াকাটা শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো জানান, সকাল থেকে বৌদ্ধ বিহারে রাখাইন নারীরা উপস্থিত হয়ে পঞ্চশীল, উপসোথ শীল গ্রহণ করেন। সকলের মঙ্গল কামনায় সমবেত প্রার্থনা করা হয়েছে। ভিক্ষু সংঘ থেকে ধর্মীয় উপদেশমূলক ধর্মালোচনা করেন আগতরা। সন্ধ্যায় নাচেগানে উৎসবমূখর পরিবেশে ফানুস উড়ানোর আয়োজন করা হয়েছে। এক থেকে তিনদিন এই উৎসব চলবে। এই প্রবারণা উৎসবকে ঘিরে উপজেলার বৌদ্ধবিহারগুলো নতুন সাজে সাজানো হয়েছে। সকাল থেকে প্রত্যেক রাখাইন পাড়ায় নানা রকম বাহারি পিঠে-পুলি তৈরি হয়েছে। করা হয় পায়েস তৈরি।
এ বিহারাধ্যক্ষ জানান, প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। যা আশ্বিনী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। এই মাসের পূর্ণিমার তিঁথিতে পালিত হয় এই উৎসব। তিনি বলেন, ‘ প্রবারণা শব্দের পালি আভিধানিক অর্থ নিমন্ত্রণ, আহ্বান, মিনতি, অনুরোধ, নিষেধ, ত্যাগ, শেষ, সমাপ্তি, ভিক্ষুদের বর্ষাবাস পরিসমাপ্তি, বর্ষাবাস ত্যাগ, ত্যাগের কার্য কিংবা শিষ্টাচার, বিধি, তৃপ্তি বা সন্তুষ্টির বিষয়। বোঝায় ক্ষতিপুরণ, প্রায়শ্চিত্ত ও ঋণ পরিশোধ।’
এই বিহারাধ্যক্ষ আরো জানান, বর্ষাবাস সমাপনান্তে ভিক্ষুগণ তাঁদের দোষত্রুটি অপর ভিক্ষুগণের কাছে প্রকাশ করেন। এর প্রায়শ্চিত্ত বিধানের আহ্বান জানান; এমনকি অজ্ঞাতসারে কোনো অপরাধ করে থাকলে তার জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করেন-এটাই পলি ভাষায় প্রবারণা পুর্ণিমা। এইদিন বুদ্ধের চুলধাতুর স্মরণে পরম শ্রদ্ধায় কাগুজে ফানুস তৈরি করে ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনে চুলামনি চৈত্যকে পূজা করার উদ্দেশে আকাশ প্রদীপ হিসেবে ফানুস বাতি উত্তোলন করা হয়। এসময় ধর্মীয় গাঁথা ব মন্ত্র পাঠ করে উৎসর্গ করে খালি পায়ে বৌদ্ধরা ফানুস উড়িয়ে দেন। মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে সাধু-ধ্বনির সুরে সুরে উড়ানো হয় ফানুস।
মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহার অধ্যক্ষ উত্তম ভিক্ষু জানান, আজ সকাল সাতটায় ধর্মীয় প্রার্থনা শীল প্রদান ও গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই দিনটির উৎযাপন শুরু হয়েছে। দিনভর ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও তৈরি করা হয় মজাদার খাবার পিঠে-পুলি। সন্ধ্যার পরে ঐতিহ্যবাহী ফানুস উৎসব হয় অধিকাংশ রাখাইন পল্লীতে। এবছর আজ প্রথম রাতে তারা অন্তত ৩০টি ফানুস ওড়ানোর কথা জানালেন।
বেতকাটা রাখাইন পল্লীর বাসীন্দা ‘ ধর্ম বিজয় বৌদ্ধা বিহারের’ সভাপতি মংচো জানান, তারা প্রথম দিনে ২০-২৫টি ফানুস উড়াবেন। গোড়া আমখোলা রাখাইন পল্লীর ‘ বিজয়রামা বৌদ্ধ বিহার’ অধ্যক্ষ সুচিন্ত মহাথেরো জানান, তারা ফাসুন উড়ানোর সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। মোট কথা সব কয়টি রাখাইন পল্লীতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সাগরপারের রাখাইনদের আড়াইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবকে ঘিরে রাখাইন পল্লীগুলোতে রাখাইন নারী-পুরুষ, শিশুরা উৎফুল্ল রয়েছে। অন্য ধর্মের মানুষের উপস্থিতি রয়েছে চোখে পড়ার মতো।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, রাখাইনরা যেন নির্বিঘ্নে বৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারে এ জন্য সকল ধরনের নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সকল ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।









