মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: ৯২৩ জন মৃত ব্যক্তিকে মোবাইল একাউন্টে বয়স্কভাতা দেওয়ার খবরের পরে এবারে ২৬৪ মৃত ব্যক্তির নামে বিধবা ভাতা প্রদানের খবর মিলেছে। আর এই খবরে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় তোলপাড় চলছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনির উপকারভোগিদের তালিকায় স্বচ্ছতার লক্ষ্যে যাচাই-বাছাই করে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন বয়স্কভাতা ও বিধাব ভাতার উপকারভোগী শত শত ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে যারা কেউ কেউ সাত-আট বছর আগে মারা গেছেন। একই অবস্থা বিধবা ভাতা প্রাপ্তদের ক্ষেত্রেও। প্রমাণ মিলেছে। এমনকি স্বামী রয়েছে এমন নারীদের নামেও বিধবা ভাতা তোলার খবর মিলেছে।
ইউএনও কাউছার হামিদ মঙ্গলবার (১৬ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে এসব তথ্য তুলে ধরে বলেন, “শুধুমাত্র ৯২৩ জন মৃত ব্যক্তির নামে ৬০০ টাকা করে তোলার কারণে সরকারের গচ্চা দিতে হচ্ছে প্রতি মাসে পাঁচ লাখ ৫৩ হাজার ৮০০ টাকা। এতে বছরে মৃত ব্যক্তিদের নামে উত্তোলন করা হয়েছে ৬৬ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ টাকা।
একইভাবে বিধবা ভাতার ক্ষেত্রে ঘটেছে এমনটি। প্রায় তিন মাস কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ইউএনও কাউছার হামিদ এমন বিস্ফোরক আলোচিত দুর্নীতির চিত্র উপস্থাপন করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের যথাযথ সহযোগিতা না থাকা ও সমাজসেবা কার্যালয়ের যথাযথ তদারকি না থাকায় বছরের পর বছর এমন দুর্নীতি চলে আসছে। সরকারের কোটি কোটি টাকা বেহাত হওয়ার পাশাপাশি নতুনভাবে বয়স্কভাতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে বহু প্রবীণ বয়স্ক মানুষ।
তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরে জানান, কলাপাড়া উপজেলায় বয়স্কভাতা প্রাপ্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১১ হাজার ৭১৪ জন। এর মধ্যে ১২ টি ইউনিয়নে মোট মৃত ব্যক্তির সন্ধান মিলেছে ৯২৭ জন। যারা এখনো নিয়মিত বয়স্কভাতা তুলছেন। মৃত ব্যক্তিদের কারো স্ত্রী, সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিরা ওই মোবাইল ব্যবহার করছেন। টাকা জমা হওয়ার পরপরই তারা তুলে নিচ্ছেন।
ইউএনও কাউছার হামিদ জানালেন, তালিকাভুক্তদের মধ্য থেকে চাকমইয়া ইউনিয়নে ৮৪ জন, টিয়াখালীতে ৩২ জন, লালুয়ায় ৮৫ জন, মিঠাগঞ্জ ৫৭ জন, নীলগঞ্জে ১১৬ জন, মহিপুরে ২৮ জন, লতাচাপলীতে ৬৩ জন, ধানখালীতে ৭৯ জন, ধুলাসারে ১৩০ জন, বালিয়াতলীতে ১২৮ জন, ডালবুগঞ্জে ৬৪ জন ও চম্পাপুরে ৬১ জন বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এর মধ্যে অনেকে ৭-৮ বছর আগেও মারা গেছেন। অথচ এখনো তাঁদের নামে বয়স্কভাতা উত্তোলন করা হচ্ছে। আর এ কারণে ৯২৩ বয়স্ক ব্যক্তি নতুনভাবে এই ভাতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া ১২ টি ইউনিয়নে বিধবাভাতা প্রাপ্ত ২৬৪ জনের মৃত্যুর তালিকা পাওয়া গেছে যারা প্রতি মাসেই বিধাব ভাতা পাচ্ছেন।
মূলত ইউনিয়ন পরিষদেও জনপ্রতিনিধিদের চরম গাফিলতির এটি একটি ভয়াবহ উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এটি স্বেচ্ছায় করা হয়নি বলে একাধিক চেয়ারম্যান জানিয়েছেন। তারা দাবি করেছেন ভাতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবার থেকে মৃত ব্যক্তির তথ্য গোপন রাখা হয়। এমনকি মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র পর্যন্ত চাইলেও দেয়া হয় না। এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল বলে তাঁদের মতামত। কিন্তু ৭-৮ বছরেও কেন এটির তথ্য উপজেলা পর্যায়ে কেন সরবরাহ কিংবা আপডেট করা হয়নি; এর সঠিক কোন সদুত্তর মেলেনি।
যেন সরকারি অর্থের অপচয়ের এক দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেন কাউছার হামিদ। এসব হিসাব বন্ধ করে দেয়ার কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বয়স্ক প্রবীণ সমানসংখ্যক ব্যক্তি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনীর আওতায় বয়স্কভাতা পাবেন; এমনটি নিশ্চিত করা হয়েছে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানান, তালিকা আপডেট কওে মৃত ব্যক্তির নাম বাদ দেয়ার কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি নতুনভাবে সমানসংখ্যক প্রবীণ ব্যক্তিকে ভাতার অন্তর্ভূক্তি করা হবে। প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। বর্তমানে এই বিষয়টি এখন কলাপাড়ার পৌরশহরসহ গ্রামের হাট-বাজারের চায়ের দোকানে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।









