পটুয়াখালীর কমলাপুরে ১৭ জুন (বুধবার) সেপটি ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে দুই ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই সেপটি ট্যাংক বা আবদ্ধ কূপ পরিষ্কার করতে গিয়ে শ্রমিক ও বাড়ির মালিকদের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। অসচেতনতা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব এবং ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনা না মানার কারণেই এই ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বদ্ধ সেপটি ট্যাংকে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসই এই মৃত্যুর মূল কারণ।
একটি সেপটি ট্যাংক দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে সেখানে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়। এই গ্যাসগুলো মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং ট্যাংকের ভেতরে অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। ফলে কেউ ভেতরে প্রবেশ করলে মুহূর্তের মধ্যেই অক্সিজেনের অভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে মারা যান। অনেক সময় প্রথমজনকে বাঁচাতে গিয়ে উপযুক্ত সুরক্ষা ছাড়াই অন্য কেউ ট্যাংকে নামলে তিনিও একই পরিণতির শিকার হন।
সেপটি ট্যাংক পরিষ্কারের সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি এড়াতে যা কোনোভাবেই করা যাবে না, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ট্যাংক খোলার সাথে সাথে ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না: সেপটি ট্যাংকের ঢাকনা খোলার পরপরই বা কয়েক মিনিটের মধ্যে কেউ ভেতরে নামবেন না। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ট্যাংকের ভেতরে ভারী ও বিষাক্ত গ্যাস জমে থাকে, যা ঢাকনা খুললেই একবারে বের হয়ে যায় না।
২. সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ছাড়া নামা যাবে না: কোনো ধরনের অক্সিজেন মাস্ক, সেফটি বেল্ট বা বিশেষ পোশাক ছাড়া শুধু সাধারণ কাপড়ে ট্যাংকের ভেতরে নামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৩. ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস আছে কি না তা পরীক্ষা না করে নামা যাবে না: ট্যাংকের ভেতরের পরিবেশ নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। (পরীক্ষার জন্য ট্যাংকের ভেতরে মোমবাতি বা দিয়াশলাই জ্বালিয়ে সুতা দিয়ে নামানো যেতে পারে। যদি আলো নিভে যায়, বুঝতে হবে সেখানে অক্সিজেন নেই এবং বিষাক্ত গ্যাস আছে। তবে সবচেয়ে নিরাপদ হলো টক্সিক গ্যাস ডিটেক্টর ব্যবহার করা)।
৪. একাকী ট্যাংকে প্রবেশ করা যাবে না: বাইরে কোনো সাহায্যকারী বা ব্যাকআপ টিম না রেখে একা একা কেউ সেপটি ট্যাংকের ভেতরে নামবেন না।
৫. উদ্ধার সরঞ্জাম ছাড়া কাউকে বাঁচাতে নামা যাবে না: ভেতরে কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে, উত্তেজিত হয়ে বা আবেগতাড়িত হয়ে অন্য কেউ কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া তাকে বাঁচাতে ট্যাংকে নামবেন না। এতে করে উদ্ধার করতে যাওয়া ব্যক্তিরও মৃত্যু ঝুঁকি শতভাগ বেড়ে যায়।
৬. অদক্ষ বা অনভিজ্ঞ লোক দিয়ে কাজ করানো যাবে না: কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই বা এই বিষয়ে জ্ঞান নেই—এমন সাধারণ দিনমজুর বা গৃহকর্মী দিয়ে জোরপূর্বক বা টাকার বিনিময়ে সেপটি ট্যাংক পরিষ্কার করানো যাবে না।
দুর্ঘটনা এড়াতে করণীয়:
সেপটি ট্যাংকের ঢাকনা খোলার পর অন্তত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সেটি খোলা রাখতে হবে, যাতে বাতাস চলাচলের মাধ্যমে বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে যেতে পারে। ট্যাংকের ভেতরে কাঁচা বাঁশ বা ফ্যান দিয়ে বাতাস ভেতরে পাঠিয়ে গ্যাস বের করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম হলো, আধুনিক মেকানিক্যাল সাকশন পাম্প ব্যবহার করে মানুষের প্রবেশ ছাড়াই মলমূত্র পরিষ্কার করা।
যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে নিজে ঝুঁকি না নিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহায়তার নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সচেতনতাই পারে সেপটি ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রুখে দিতে।









