মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় চম্পাপুর ইউনিয়নের দেবপুর এলাকায় তীব্র ভাঙনকবলিত রাবনাবাদ নদী থেকে ফ্রি-স্টাইলে বালু উত্তোলন চলছে। এমনিতেই ভাঙনের কারণে সেখানকার দীর্ঘ এলাকার কৃষিজমিসহ বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অন্তত চারশ’ পরিবার বাড়িঘর জমিজমা হারিয়েছে নদী ভাঙনের ফলে। ওই নদী থেকে অব্যাহত বালু উত্তোলনে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় বালু উত্তোলন কিছু সময় বন্ধ ছিল। এখন আবার ফ্রি-স্টাইলে দিনে-রাতে বালু কাটা চলছে। নদী তীরের মানুষ একারণে বাড়িঘর ফসলি জমি নদীগর্ভে দ্রুত বিলীনের শঙ্কায় বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন। তারা চরম উৎকন্ঠা প্রকাশ করছেন। সরকারের ঘোষিত নির্দিষ্ট বালুমহাল (খাজুরা) থেকে বালু উত্তোলন করার নিয়ম থাকলেও গায়ের জোরে একটি প্রভাবশালী মহল রাবনাবাদ নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এতে নদী ভাঙন তীব্র হচ্ছে। পায়রা বন্দরসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে এসব বালু চড়ামূল্যে বিক্রি করে বিশেষ মহলটি কোটি কোটি টাকা মুনাফা করলেও সরকারি প্রশাসন এ বিষয়ে নীরব রয়েছে। ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বঞ্চিত থাকছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, গত নয় বছর ধরে এই নদীতে বালু উত্তোলন প্রক্রিয়া শুরু হয়। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি-মন্ত্রীর সহোচররা শত শত কোটি টাকার বালু উত্তোলন করে অবৈধ পন্থায় বিত্তবৈভব গড়ে তোলে। ওই সরকারের পতন হলেও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। প্রশাসনের গাফিলতি কিংবা সংশ্লিষ্টতার কারণে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন কখনো থামেনি।
কয়েকটি প্রভাবশালী মহল এখনো এই অবৈধভাবে রাবনাবাদ নদী থেকে বালু উত্তোলন প্রক্রিয়া চলছে। ফলে রাবনাবাদ পাড়ের অন্তত দশ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের অর্ধেকটা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বিশেষ করে দেবপুর থেকে করমজাতলা পর্যন্ত গোটা এলাকার বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। কয়েকদফা জরুরি প্রটেকশনের নামে কয়েক কোটি টাকার জিওব্যাগ-জিও টিউব দিলেও তা কয়েক মাসের মধ্যেই আবার নদীতে ভেসে গেছে।
স্থানীয় বাসীন্দা মো. রেজাউল জানান জানান, অন্তত ১০ মাস আগে গেল বছর রাবনাবাদ নদীর জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধের ভাঙন রক্ষায় দেওয়া জিও টিউব জিওব্যাগসহ প্রায় চার শ’ ফুট বাঁধের টপসহ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ঢেউয়ের ঝাপটায় সব শ্যাষ, বাঁধের মধ্যে পানি ঢুকে সব ডুবে গেছে। জরুরি মেরামতের বছর যেতেই তারা আবার বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
বাঁধের পাশের বাসীন্দারা এও জানান, বছরের পর বছর রাবনাবাদ নদী থেকে অসংখ্য ড্রেজারের বালু কাটায় এখানটায় ভাঙনের ঝুঁকি আরো বেড়েছে। প্রবল ভাঙনে সব শেষ হয়ে গেলেও বালু কাটা বন্ধ হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, কলাপাড়া উপজেলার ৫৪/এ পোল্ডারের গোটা বেড়িবাঁধটিই রাবনাবাদ নদীর ভাঙনে প্রতিবছর বিলীন হচ্ছে।
নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। বালু কাটছেন একটি গ্রুপ। জানান, তারা ধানখালী সংলগ্ন রাবনাবাদ নদী থেকে একেক ট্রিপে তিন হাজার সিএফটি বালু কেটে আনছেন। এভাবে নির্দিষ্ট বালুমহাল ‘খাজুরা’ বাদ রেখে যে যার মতো অতি ভাঙনপ্রবণ নদী ইলিশের আহরণ ক্ষেত্র দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলের বিভিন্ন স্থান থেকে ফ্রি-স্টাইলে ড্রেজার লাগিয়ে বালু উত্তোলনে জনপদ, কৃষিজমি, বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
অপরদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, সরকার নির্দিষ্ট বালুমহাল আন্ধারমানিক নদীর সাগর মোহনায় ‘খাজুরা’ বালুমহাল রয়েছে, যা ইজার দেওয়া হয়। যেখান থেকে ফি বছর সরকার কমপক্ষে ৬৮ লাখ টাকার রাজস্ব আয় করে থাকে। ওই বৈধ বালুমহালটি প্রায় ২৫৩ একর এরিয়া জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে। এই একমাত্র বৈধ বালুমহাল ছাড়া আর কোন নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।









