বিশেষ প্রতিবেদক, পটুয়াখালী: পটুয়াখালী জেলাজুড়ে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত ঝটিকা অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা এবং মাদক বিক্রির নগদ টাকাসহ মোট ১৭ জন মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের এই কঠোর অবস্থান জেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফেরালেও, মাদকের বিস্তৃতি নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) এসআই (নিরস্ত্র) কমল বড়াল সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে মাদক উদ্ধার ও ওয়ারেন্ট তামিল ডিউটি পালনকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন, পটুয়াখালী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কসাইপট্টি এলাকার শহীদ কটেজের সামনে কয়েকজন ব্যক্তি ইয়াবা ক্রয়-বিক্রয় করছে। সংবাদের ভিত্তিতে রাত ১টা ৫ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে অভিযান চালায় পুলিশ। এসময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন পালিয়ে গেলেও মোঃ ফারুক গাজী (৪৩) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তিনি টাউন জৈনকাঠী এলাকার বাসিন্দা।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুমকী এলাকায় অভিযান চালিয়ে গাঁজাসহ দুই যুবককে আটক করে পুলিশ। সন্ধ্যায় উপজেলার লেবুখালী ইউনিয়নের পশ্চিম লেবুখালী এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সুলিজ ঘাটসংলগ্ন পাকা সড়কে এ অভিযান চালানো হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দুমকি থানার এসআই মো. সজিব সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ দুইজনকে আটক করতে সক্ষম হয়। তবে একজন ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে পালিয়ে যান।আটক ব্যক্তিরা হলেন মো: আশিক মোল্লা (২০) ও লাগিব মিনার (১৯)। পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তির নাম আবদুল্লাহ গাজী (৪০) বলে জানিয়েছে পুলিশ।পুলিশের দাবি, আটক আশিক মোল্লার দেহ তল্লাশি করে তাঁর জিন্স প্যান্টের পকেট থেকে সাদা পলিথিনে মোড়ানো ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা গাঁজার আনুমানিক বাজারমূল্য পাঁচ হাজার টাকা। এ ঘটনায় দুমকী থানায় ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(১) এর ১৯(ক)/৪১ ধারায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আটক দুই আসামিকে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
এর আগে দুমকী উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের মাদক মামলার দীর্ঘদিনের পলাতক ও পরোয়ানাভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে উপজেলার পশ্চিম আঙ্গারিয়া এলাকা থেকে তৌহিদুল ইসলাম দিপু (২৫) নামের ওই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি পশ্চিম আঙ্গারিয়া এলাকার বাসিন্দা মো. ইদ্রিস মৃধার ছেলে। বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেল ৫টার দিকে দুমকী থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল এ অভিযান পরিচালনা করে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দীপুর বিরুদ্ধে ২০২০ সালের একটি মাদক মামলায় (জিআর ৩০/২০) আদালতে দীর্ঘদিন ধরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। মামলার পর থেকেই তিনি এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ বেশ কিছুদিন ধরে নজরদারি চালিয়ে আসছিল। পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন—এমন সংবাদের ভিত্তিতে দুমকি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নির্দেশনায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জেলা পুলিশের সরবরাহকৃত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েকদিনে ইয়াবার বড় বড় চালান ধরা পড়েছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে গত ৩ মে ও ৪ মে। ৩ মে রাতে সদর থানার বদরপুর ইউনিয়নের টেংরাখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০.১০ কেজি গাঁজা এবং মাদক বিক্রির নগদ ১,২৩,৪৫০ টাকাসহ জেবুন্নেছা ফাতেমা ও রাহাত মৃধাকে গ্রেফতার করা হয়। ৪ মে ডিবি পুলিশের একটি চৌকস টিম ইটবাড়িয়া এলাকা থেকে ৫১৫ পিস ইয়াবাসহ সুমন মোল্লা ও নুরুজ্জামানকে গ্রেফতার করে। একই দিনে দশমিনা থানা পুলিশ পৃথক দুটি অভিযানে মাছুয়াখালী ও বগুড়া এলাকা থেকে মোট ৮৫ পিস ইয়াবা এবং নগদ ২,০০,০০০ টাকাসহ চারজনকে গ্রেফতার করে। এ দিকে পটুয়াখালী’র শহরাঞ্চলে ডিবি’র তৎপরতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। ৬ মে রাতে পটুয়াখালী পৌরসভা ও মহিপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা ও হেরোইনসহ ফরিদ খান ও বাশার হাওলাদারকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। এছাড়া ২ মে রাতে থানাপাড়া এলাকা থেকে ১২৫ পিস ইয়াবাসহ মহিবুল্লাহ রাসেল ও মেহেদী হাসান সোহেলকে গ্রেফতার করা হয়।
বদরপুর ইউনিয়নে ১০ কেজির বেশি গাঁজাসহ নারী মাদক ব্যবসায়ী জেবুন্নেছা তার ছেলেসহ গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয় যে, পটুয়াখালীতে মাদক ব্যবসায় এখন পরিবারের সদস্যরাও জড়িয়ে পড়ছে। সপ্তাহব্যাপী অভিযান গুলোতে মাদক বিক্রির মোট ৩,২৩,৪৫০/- নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, জেলায় মাদকের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে। পটুয়াখালী পৌরসভা থেকে শুরু করে মহিপুর বা দশমিনার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইয়াবা ও হেরোইন পৌঁছে যাচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ব্যক্তিরা রয়েছেন, যা নির্দেশ করে যে সমাজের যুব ও মধ্যবয়সী একটি বিশাল অংশ এই মরণনেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার মোঃ আবু ইউসুফ গণদাবীকে জানান, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ পুলিশকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিদের্শনা এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে পটুয়াখালী জেলা পুলিশ মাদক,চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থেকে আইন প্রয়োগের লক্ষ্যে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এ অভিযানে জেলা পুলিশ বিপুল পরিমান ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন সহ বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।অভিযানের ফলাফল বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, এতদ্অঞ্চলে মাদকের ব্যপক বিস্তৃতি রয়েছে। এমতাবস্থায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও সর্বক্ষেত্রে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পটুয়াখালী জেলার সকল প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগনের অংশগ্রহণ জরুরি। আসুন আমরা সবাই মিলে সর্বনাশা মাদক রুখে দেই।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু গ্রেফতার করলেই মাদক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের মূল হোতা বা ‘গডফাদার’দের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। পটুয়াখালীকে মাদকমুক্ত করতে জেলা পুলিশের এই ঝটিকা অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জেলার সাধারণ নাগরিকরা। এখন দেখার বিষয়, এই কঠোর অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে জেলা থেকে মাদকের শেকড় উপড়ে ফেলতে কতটা সফল হয়।









