মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: বর্ণাঢ্য এক অন্তেষ্টিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় রাখাইনদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। তাঁদের ধর্মীয় আঞ্চলিক এক নেতাকে (গুরু) রাজকীয় সম্মাননা দিয়ে শেষ বিদায় জানান হাজার হাজার ভক্তরা।
সারা দেশ থেকে আগত অসংখ্য বৌদ্ধভিক্ষু, উপাসক ও রাখাইন সাধারণ নারী-পুরুষের অংশগ্রহনে রাখাইনপাড়া তুলাতলীতে তিনদিন ধরে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। সাগরপারের কলাপাড়ার এই জনপদের এককালের দাপুটে সম্প্রদায়ের উপস্থিতি যেন তাঁদের স্বকীয়তার ছাপ ফেলেছিল। তাঁদেও পদচারণায় দীর্ঘ বছর পরে এই জনপদ মুখরিত হয়ে ওঠে।
রাখাইন বৌদ্ধভিক্ষু সংঘ প্রধান সংঘরাজ উকুইন্দা মহাথেরোর জমকালো এই শেষকৃত্যানুষ্ঠানকে ঘিরে তুলাতলী রাখাইনপল্লীতে নজর ছিল এই জনপদের সকল মানুষের। ভিন্ন ধর্মের মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়। গত ২৫ বছরে রাখাইনদের ধমর্ীয় নেতাদের আরো কয়েকটি বর্ণাঢ্য অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এবারের তিন দিনের জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল বৃহৎ পরিসরে। রাখাইনরা তাঁদের ধর্মীয় এই সংঘপ্রধানকে সম্মান জানাতে আসেন।
শেষ বিদায়ে শামিল হয়েছিলেন। শিশু কিশোর থেকে তরুণ-তরুণী, বয়োবৃদ্ধরা ছিলেন তিনদিনের এই সৎকার অনুষ্ঠানে। শোকের আবহের মধ্যেই এই সংঘপ্রধানের বর্ণিল বিদায়কে ঘিরে রাখাইনরা ধর্মীয় সকল আচারাদি পালন করেন। গত ২৬ ডিসেম্বর শুরু হয়ে তিনদিনের ধমর্ীয় রীতির পাশাপাশি ভালোবাসা আর সম্মান ও সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন। ২৮ মার্চ শেষ বিকালে ধমর্ীয় এই নেতার শবদেহকে বারুদের শুটের মধ্য দিয়ে দাহ সম্পন্ন করা হয়। রাখাইন পাড়ার অসংখ্য বৌদ্ধবিক্ষু, উপাসকসহ সাধারণ নারী-পুরুষ এই নেতাকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে অন্তিম বিদায় জানান।
২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ৯টা ৩৯ মিনিটে রাখাইনদের ধর্মীয় গুরু সংঘরাজ উকুইন্দা মহাথেরো পরলোক গমন করেন। তুলাতলী রাখাইনপল্লীর বৌদ্ধবিহারের বৌদ্ধবিক্ষু হিসেবে তার ছিল বর্ণাঢ্য জীবন। ৮৭ বছর বয়সী রাখাইন বৌদ্ধভিক্ষু সংঘ প্রধান সংঘরাজ উকুইন্দা মহাথেরো ৬৬টি বর্ষবাস করেন। অর্থাৎ বৌদ্ধভিক্ষু হিসেবে ৬৬টি বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। যা ছিল একটি রেকর্ড।
এই ধর্মের প্রচার ও প্রসারে তার ভুমিকাকে স্মরণীয় করে রাখতেই রাখাইনদের এমন আয়োজন ছিল। শোকের আবহের মধ্যেই ছিল তার শান্তির কামনায় রাখাইনদের বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানমালা। বাহারি ণৃত্যের পাশাপাশি বর্ণিল এই অনুষ্ঠানমালাকে ঘিরে রাখাইন জনগোষ্ঠী ফিরে পেয়েছিলেন তাঁদের এই জনপদে বিচরণের স্বকীয়তার পুরনো স্পর্শ। স্মৃতিতে অমলিন করে রাখলেন সংঘপ্রধানের শেষকৃত্যানুষ্ঠানকে।
কুয়াকাটা শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশী ভান্তে জানান, উনি ছিলেন সংঘের প্রধান। তার ভাষ্য, ‘সকল ভিক্ষুদের বেলায় এমনটি হয় না। যারা সাধারণত একটা অঞ্চল কিংবা দেশের সংঘের প্রধান হন তাদের বেলায় এমন সম্মান দেখানো হয়। মূলত ভিক্ষু সংঘের প্রধান প্রয়াণের পর শুধুমাত্র তামাক পাতা দিয়ে শরীর পেচিয়ে মমি করে রাখা হয়।’ কতদিন রাখা হয় তা নির্ধারন হয় আয়োজনের ব্যপ্তির ওপর নির্ভর করে।
অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল মাঠ নির্ধারণ করে ওখানকার নির্দিষ্ট সাজসজ্জা করা হয়। সেখানে শবদেহ শান্তিকুঠির দোলনায় রাখা হয়। প্রথমদিনে সকাল সাড়ে নয়টায় স্যাংনৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। অন্তিম রথযাত্রা, স্রেজাই পালন করা হয়। সংঘপ্রধানের সবদেহ পালং দোলনা শান্তিকুঠি দানকারীদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। মূলত বৌদ্ধমন্দির থেকে ওই দিনই সংঘ প্রধানের শবদেহের শেষ যাত্রা হয়।
রাখাইন নারী-পুরুষ সকলের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে উকুইন্দা মহাথেরোর শবদেহ ছন্দগুন দ্বারা মূল ময়দানে নেওয়া হয়। বিকেল থেকে শবদেহ পালং দোলনা শান্তির কুঠিঘরে ধমর্ীয় কীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। স্যাংনৃত্য ও অন্তিম রথযাত্রা, ধমর্ীয় আলোচনা, ধর্মদেশনা ও রাতে থাকে সংরক্ষিত অনুষ্ঠানমালা।
দ্বিতীয় দিনে স্যাংনৃত্য রথযাত্রার পাশাপাশি ভিক্ষু সংঘের পিন্ডদান ও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। শেষ দিনেও একই অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিকেলে প্রয়াত উ কুইন্দা মহাথেরোর শবদেহকে কেন্দ্র করে শেষকৃত্যানুষ্ঠানে ব্যাপক আতশবাজি প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন ও বন্দনা জানানো হয়। শোকাবহ পরিবেশের মধ্যে কেউ কেউ আবার আনন্দঅশ্রু সংবরণ করেন। কারণ তাঁকে উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশে শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। সবশেষ ভস্ম সংগ্রহ করে শেষ চিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণের জন্য তুলাতলী পাড়ার একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্মৃতিমন্দির করার গোড়াপত্তন করা হয়েছে। যেখানে ফলক লাগানো হবে।
ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু জানান, এবারে পাঁচটি দলে মোট ৬০ ধরনের নৃত্য পরিবেশন করেন রাখাইন যুবরা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৫৯ জন ভিক্ষু এই অন্তেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেন। এ লক্ষ্যে ৪৫০ জনকে সংযুক্ত করে বাস্তবায়ন কমিটি গঠণ করা হয়। শত দৈন্যের মধ্যেও এই ধর্মের সদ্ধর্মপ্রাণ উপাসক-উপাসিকাদের দানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। যেখানে ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সরকারিভাবে জেলা প্রশাসন থেকে একটন চাল বরাদ্দ দেওয়ার কথা জানালেন আয়োজকরা।
এবারের অনুষ্ঠানে চারটি অলংনৃত্য মঞ্চ, দুইটি রাজবিহার, একটি রথ রাজ পালঙ্ক এবং ভিক্ষু সংঘের বসার মঞ্চ এবং উপাসক ও উপাসিকাদের জন্য আলাদা মঞ্চ করা হয়েছে। বারুদভর্তি বোম শুট করার জন্য ৩০টি দল ছিল। উপাসকরা সংঘপ্রধানে সবদেহে একেকবারের জন্য আট শ’ টাকা দানের মধ্য দিয়ে শুট করেন। এর জন্য আগেই তালিকা তৈরি করা হয়।
এক কথায় ‘মহাগুরুকে পরম শ্রদ্ধা প্রদান ও শেষ বিদায়ের পথে এগিয়ে দিয়ে আসার’ ম্যাসেজটি ছিল এমন বর্ণাঢ্য অন্তেষ্টিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। উল্লেখ্য এর আগে সবশেষ ২০১০ সালে তালতলী পাড়ায়। ২০০৭ সালে কলাপাড়ার আলীপুর বন্দরে রাখাইন পল্লী কালাচানপাড়া এবং ২০০০ সালে তালতলীর ছাতনপাড়ায় ধমর্ীয় এক গুরুর বর্ণাঢ্য অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। তবে এবারে তুলাতলীপাড়ার অন্তেষ্টিক্রিয়া ছিল জমকালো। এক কথায় ছিল বর্ণাঢ্য।









