মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় এখন মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন চলছে। চলছে রমরমা বাণিজ্য। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ ইয়াবা। ফলে যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় তলানিতে পৌছেছে। এখানে ইয়াবার ব্যবসায় সরাসরি জড়িত রয়েছে হাজারো কারবারি। খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা রয়েছে অসংখ্য। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদেও চলছে মাদকের ফ্রি-স্টাইল বাণিজ্য। মাদকের বাধাহীন বিস্তারে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকরা চরম শঙ্কায় পড়েছেন। কিশোর থেকে তরুন যুবদের নিয়ে তাঁদের পরিবার পরিজন ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের শঙ্কায় পড়েছেন।
এই জনপদে মূলত মাদকের বাণিজ্যিক কর্মকান্ড শুরু হয় ২০১৭ সাল থেকে। তখন থেকেই কক্সবাজার-কুয়াকাটা নৌরুটে ইয়াবাসহ মাদকের বড় বড় চালান আসতে থাকে। কারবারির মাধ্যমে মাদকের চালান পৌছে যায় মাঠ পর্যায়ের বিক্রেতাদের হাতে। হাত বদল হয়ে রুট লেভেলের কাস্টমারের কাছে পৌছে দেওয়ার চিহ্নিত একাধিক সিন্ডিকেট তৈরি হয়। মাদকের একাধিক বড় চালান বিগত দিনে ধরা পড়লেও নৌপথের গডফাদারসহ শেল্টারদাতারা সবসময় রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত দেড় বছরে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ইয়াবাসহ মাদক সিন্ডিকেট মাঠ পর্যায়ে তাঁদের ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। যা বর্তমানে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌছেছে। কোন না কোন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মাদকের এই ব্যবসা সচল থাকে।
বর্তমানে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, এমন কোন ইউনিয়ন নেই যেখানে ইয়াবাসহ মাদকের কারবারি ও বিক্রেতা নিয়ে অন্তত ১০০ সদস্য নেই। কোন ইউনিয়নে আবার সহস্রাধিক। মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে নিজেদের রক্ষায় কলাপাড়ায় এক পরিবারের বাবা-মা স্থানীয়দের নিয়ে নিজেদের সন্তানের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। লালুয়া ইউনিয়নে এই প্রতিবাদ করেন এক বয়োবৃদ্ধ দম্পতি।
মাদকের সবচেয়ে বড় চালান ধরা পড়ে ২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর। সাগরপথে মিয়ানমার থেকে কুয়াকাটায় আসে ইয়াবার এই চালান। র্যাবের সফল ওই অভিযানে ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৫৬ পিস ইয়াবা আটক করা হয় আন্ধারমানিক সেতুর টোলপ্লাজা সংলগ্ন সড়ক থেকে। জব্ধ করা হয় প্রাইভেট কার বিদেশী পিস্তল, গুলি, মোবাইলসহ একাধিক সীম। গ্রেফতার হয় টেকনাফের ইব্রাহীম ও উখিয়ার রোহিঙ্গা আলম। কলাপাড়া থানায় পৃথক দু’টি মামলা হয়। এঘটনার পর থেকে কলাপাড়ার গোটা উপকূলীয় এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়।
র্যাব বরিশাল ৮ এর তখনকার সময়ের ডিএডি মোঃ আমজাদ হোসেন এজহারে উল্লেখ করেছেন ৩৩৮৫টি প্যাকেট করে ২০ কোটি ৩১ লাখ টাকার ইয়াবা দুইটি কর্কসিটের বক্সের মধ্যে প্রাইভেট কারের পেছনের ডালার মধ্যে রাখা ছিল। আটকদের একজন টেকনাফের লেদা গ্রামের মোস্তাক সওদাগরের ছেলে শরীফ। শরীফ এ মাদক মিয়ানমার থেকে সরাসরি কুয়াকাটা রুটে পাচার করে আসছে। আল্লাহর দান নামের একটি ট্রলারে খোরশেদ মাঝির মাধ্যমে আনা-নেয়া করে।
আারও একাধিক ট্রলারে আগেও কয়েক চালান ইয়াবাসহ মাদক খালাশ করা হয় এই রুটে। টেকনাফের পূর্ব পানখালী গ্রামের বাদশা খলিফার ছেলে এই মাহমুদুল্লাহ মাদকের বড় হোতা। মায়ানমার, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এই মাদক আনার পরে তার কাছে মজুদ থাকে। এরপরে বিভিন্ন কারবারির কাছে সরবরাহ করা হয়। এ চক্রের সঙ্গে জড়িত আলীপুর-মহীপুর মৎস্যবন্দরসহ কুয়াকাটার স্থানীয় রুট কারবারি গডফাদাররা তখন তটস্থ হয়ে পড়ে।
নিশ্চিত হওয়া গেছে, নৌপথে এই মাদক পরিবহনে এক ধরনের নাম-নম্বর বিহীন ট্রলার ব্যবহৃত হয়। এরপরও এই চালানের হোতাদের নিয়ে কোন অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। এরপরেও কয়েকটি বড় চালান আটক হয় বিভিন্ন সময়।
কক্সবাজার থেকে সাগরপথে কুয়াকাটায় আসা ইয়াবার আরেক বড় চালান আটক হয় ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে। সাগর মোহনা আন্ধারমানিক নদীর প্রবেশপথ লেম্বুরচর থেকে চার লাখ পিস ইয়াবাসহ একটি মাছ ধরার ট্রলার জব্দ করা হয়। এ সময় ১৬ জেলেকে আটক করা হয়। র্যাব কোস্টগার্ড সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে এ পরিমাণ ইয়াবা জব্দ করেন। বাংলাদেশ কোস্টগার্ড (বিসিজি) স্টেশন নিজামপুরে কোস্টগার্ড দক্ষিণ জোনের স্টাফ অফিসার লে. কমান্ডার মো. তানভির আজবাল হৃদয় এ বিষয় আনুষ্ঠানিক তখন ব্রিফিং করেন।
কক্সবাজার থেকে এই ইয়াবা আনা হয়েছে। আটক জেলেদের অধিকাংশের বাড়ি কক্সবাজারে। ট্রলারটির মালিক কক্সবাজারের আব্দুল জলিল। নাম এফবি মায়ের দোয়া। আটক জেলের একজনকে ইতোপূর্বে আরেকবার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে উৎপাদিত ইয়াবা প্রথমে ছোট ছোট নৌকা কিংবা ট্রলারযোগে বঙ্গোপসাগরে আনা হয়। এরপরে গভীর সমুদ্রে নির্দিষ্ট স্থানে বাংলাদেশি ট্রলারের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়। এই ট্রলারগুলো কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী হয়ে কুয়াকাটা উপকূল পর্যন্ত পৌছে দেওয়া হয়। পাচারে সাগরপথের এই পদ্ধতিগুলি অনেকটা কম বিপজ্জনক বলে মনে করেন মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
সূত্রমতে, কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকায় নজরদারি আগের চেয়ে বেড়েছে। তুলানমুলক কুয়াকাটা-কলাপাড়া উপকূলে নজরদারি কম রয়েছে। এ কারণে মাছ ধরার ট্রলারের আড়ালে সহজে মাদকবাহী ট্রলার চলাচলের সুযোগ রয়েছে। গভীর সাগরবক্ষে এক ট্রলার থেকে অন্য রুটের ট্রলারে সহজেই মাদক হস্তান্তর করা যায়। এসব কারণে এই রুটকে মাদক সরবারাহের জন্য নিরাপদ মনে করছেন সিন্ডিকেট সদস্যরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন তথ্যমতে, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠী ও পাচার চক্রের যোগসাজশে বাংলাদেশের স্থানীয় হোতারা ও ট্রলার মালিক, মাঝিরা মাদকের চালান বহন করে আসছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের একটি চক্র ক্যারিয়ার বা বহনকারী হিসেবে কাজ করে আসছে। কলাপাড়া উপজেলার আলীপুর মৎস্য বন্দরের কয়েক রোহিঙ্গা সদস্য মাদকের এই কারবারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে। এরা বিগত সরকারের সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এখানকার নাগরিক হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মনে করেন, সমুদ্রপথে পাচার হওয়া ইয়াবাসহ মাদকের চালান শণাক্ত করে জড়িতদের আটক করা খুবই কঠিন কাজ। এছাড়া অসংখ্য ট্রলার সমুদ্রে মাছ ধরে এর মধ্যে কোন ট্রলারে মাদকের চালান রয়েছে তা শণাক্ত করা দূরুহ ব্যাপার। আর কোন ঘাটে মাদকের চালান খালাশ করা হয় তাও সঠিকভাবে শণাক্ত করা যায় না। ছোট ছোট শত শত ঘাট রয়েছে, যেখানে মাছ লোড-আনলোড করা হয়। শতকরা দশ ভাগ মাদকের চালানও মূলত প্রশাসনের অভিযানে আটক করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা যায় না।
মহিপুর থানার ওসি মো: শামীম হাওলাদার জানান, পুলিশ মাদক নির্মূলে সক্রিয় রয়েছে। ২০২৫ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত থানায় মোট মাদক সংক্রান্ত ৭৫ টি মামলা হয়েছে।
কলাপাড়া থানার ওসি মো: নজরুল ইসলাম জানান, কলাপাড়া থানায় এবছর ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে মাদক সংক্রান্ত আটটি মামলা হয়েছে। তিনি জানান, মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য তাঁদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, এ বছরের এপ্রিল মাসের ২৬ তারিখ পর্যন্ত মোট ৮৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য উদ্ধার ধ্বংস করে অসংখ্য সেবনকারীকে দন্ড দেওয়া হয়েছে। এই অভিযান চলমান রয়েছে।









