কলাপাড়া প্রতিনিধি: বরাবরের মতো এ বছরও ১৬ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন কৃষক নির্মল চন্দ্র মিস্ত্রি (৫০)। চারাগুলো লক লক করে বেড়ে উঠেছে। গোঠা মাঠটি গাড়ো সবুজের আস্তরণে পরিণত হয়েছে। বাম্পার ফলনের আশায় দিন গুনছেন নির্মল চন্দ্র। এখন পর্যন্ত তার প্রায় দেড়লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে অন্তত ৪০০ মণ ধান পাওয়ার আশা পোষণ করছেন এই কৃষক। কিন্তু তাঁকে এখন সেচ সংকটের আশঙ্কা প্রবলভাবে শঙ্কিত করে তুলেছে। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সংলগ্ন পাখিমারার খাল থেকে পানি সেচ দিয়েছেন। কিন্তু এখন খালের পানি তলদেশে পৌছেছে। শেষ পর্যন্ত পানি থাকবে কিনা তা নিয়ে মহা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তারপরও যতটুক পানি আছে তা আবার অপর গ্রাম এলেমপুরের কৃষক অসংখ্য পাম্প লাগিয়ে তাঁদের খালে নিয়ে যাচ্ছে। এটিও তাকে আরেক দফা শঙ্কায় ফেলেছে।
একই শঙ্কায় রয়েছেন গ্রামটির মুকুল মৃধা। তিনি চাষ করেছেন ৬বিঘা জমিতে। নয়ন হাওলাদার আবাদ করেছেন ৮ বিঘা জমি। সুখ কুলু ৪ বিঘা ও মহাদেব হাওলাদার ১০ বিঘায় বেরোর (হাইব্রিড) আবাদ করেছেন। সবার শঙ্কা শেষ পর্যন্ত সেচের পানি থাকবে কি না।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নেয়ামতপুর গ্রামের অধিকাংশ বোরো চাষী এখন পানির সংকটের শঙ্কায় রয়েছেন। বোরোর ফলন শেষ পর্যন্ত ঘরে তোলা নিয়ে তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বোরোর ফসল নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এলেমপুর গ্রামের চাষীরা। তাঁদের খালটিতে এক ফোটা পানিও নেই। পানি নিয়ে যেন কাড়াকাড়ি শুরু হয়েছে।
সবজিসহ কৃষি আবাদের হাবখ্যাত নীলগঞ্জ ইউনিয়নের চাষীদের সেচ দেওয়ার মতো সবচেয়ে বড় মিঠাপানির জলাধার পাখিমারার দীর্ঘ খালটি। এই খালের পানি এখন আছে তলদেশে। খালটির পঞ্চায়েত বাড়ির বাঁধের পূর্বউত্তরদিকের প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ শুকিয়ে গেছে। পানি আগেই এলেমপুর গ্রামের কৃষকরা সবজি ও বোরোর ক্ষেতে সেচ দিয়েছেন। এখন সংকট কিছুটা লাঘব করতে পাখিমারা খালের পশ্চিম অংশ থেকে শুক্রবার থেকে ১২টি পাম্প লাগিয়ে পানি নেওয়া হচ্ছে তাঁদের অংশে।
এই কাজে তদারকি করা কৃষক সাইফুল ইসলাম জানালেন, তাদের গ্রামের কম করে হলেও অন্তত ৫০-৬০ কানি (প্রায় ৫০০ বিঘা) জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়েছে। তিনিও করেছেন ৫ বিঘায়। কিন্তু খালে এখন এক ফোটাও পানি নাই। তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনওর) পারমিশন নিয়ে খালের এক পাশের পানি তাঁদের অংশে নিচ্ছেন।
সাইফুল জানান, যেখান থেকে পানি নেওয়া হচ্ছে তা দিতে অসম্মতি ছিল কুমিরমারা ও নেয়ামতপুরের কৃষকের। কারণ তাঁদের ক্ষেতে সেচ সমস্যা হতে পারে তাই তাঁরা বাধা দেয়। তাই বিরোধের কারণে উপজেলা থেকে পারমিশন নিয়েছেন। খালের যতটুকু (৮-৫ফুট) পানি যা আছে তার থেকে এক-দেড় ফুট পানি তারা নিবেন বলে জানালেন। এ পানিতে কতটুকু সেচ সংকট মিটবে তা জানেন না অধিকাংশ কৃষক। এভাবে পাখিমারা খালের দুই পাড়ের পাঁচ গ্রামের চাষীরা এবছর বোরোর আবাদ ঘরে তোলা নিয়ে আগাম সেচ সংকটের শঙ্কায় মহা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
এলেমপুর গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে অধিকাংশ ক্ষেতে কৃষকরা আগেভাগেই খাল থেকে আগেই পাম্প লাগিয়ে সম্পুর্ণ পানি ক্ষেতে দিয়ে রেখেছেন। বোরোর ক্ষেতে এক-তিন ইঞ্চি পর্যন্ত পানি রয়েছে। অনেকে আবার পুকুর ডোবায় পানি সংরক্ষণ করেছেন।
দেড় বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন কৃষক দেলোয়ার হোসেন। তিনি গ্রামেই দোকান করেন। জানালেন, সংলগ্ন হুআইর্যার খালটি শুকিয়ে গেছে। ফেটে চৌচির হয়ে আছে। আগেভাগেই এই কৃষক একটি ডোবায় পানি মজুদ করেছেন।
দেলোয়ার জানালেন, অনেক বলে-কয়ে সবাই চাঁদা তুলে এখন পাখিমারার বড় খাল থেকে কিছু পানি আনছেন। কারেন্ট খরচ বাবাদ কমবেশি টাকা দিয়েছেন। ভরসা ওই পানি। তারপরও বৃষ্টি না হলে বোরোর ফলন ঘরে তোলা নিয়ে সবাই মহা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। এভাবে সেচ সংকটের কারণে পাঁচটি গ্রামের সহস্রাধিক বোরো চাষীর এবছর ফসল ঘরে তোলা নিয়ে মহা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে অধিকাংশ কৃষকের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি সমাপ্রসারণ কর্মকর্তা মো. নাহিদ হাসান জানান, এবছর কলাপাড়ায় পাঁচ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। যেখানে গেল বছর আবাদ হয়েছিল ৩৩৮০ হেক্টর। চাষীর সংখ্যা অন্তত সাত হাজার।
এ বছর সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে নীলগঞ্জ ইউনিয়নে। সেখানকার কৃষকরা কোন ধরনের চিন্তা ধারনা ছাড়াই আবাদ করেছেন। খালে যে পরিমাণ পানি ছিল তাতে যতটুকু জমিতে বোরোর আবাদ করা যাবে তার চেয়ে কয়েকগুন বেশি জমিতে আবাদ করেছেন। ফলে ফলন মার খাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, বোরোর আবাদকাল প্রায় ১৫০দিন। তাতে এখনো ফলন ঘরে তুলতে আরো ৪০-৫০ দিন সময় লাগবে। তাতে বৃষ্টি না হলে রিক্স থেকেই যাবে। কৃষকরা পরিকল্পনা ছাড়াই এবছর নীলগঞ্জে বোরোর বেশি আবাদ করেছে। তারপরও যতটুকু পানি সংরক্ষণ আছে তা ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য একটা শৃঙ্খল নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, কৃষকের সমস্যা সমাধানে কৃষি বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে সেচের পানি নিয়ে কোন সমস্যা তৈরি না হয় এমন নির্দেশনা রয়েছে।









