কুয়াকাটা প্রতিনিধি: কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে আসছে অসংখ্য মৃত জেলি ফিশ। গত তিন দিন ধরে মৃত জেলিফিশে সৈকতে কিছুটা দূষণ সৃষ্টি হয়েছে। বেলাভূমে আটকে থাকা মৃত জেলিফিশ রোদে শুকিয়ে দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ছোট-বড় হাজার হাজার জেলিফিশ কুয়াকাটা সৈকতের দীর্ঘ বেলাভূমে আটকে আছে। জেলেরা দাবি করেছেন সাগরের পানিতে লবণাক্ততা বাড়ায় জেলিফিশগুলো মারা পড়ছে। মূলত জেলিফিশ মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। ক্রমশ মৃত এই জেলিফিশের পরিমাণ বাড়ছে। সাগরে জাল পাতলেই জেলিফিশে আটকে যায় জাল। জেলেরাও একারণে বিপাকে রয়েছেন। তারা মাছ ধরা নিয়ে বন্ধের শঙ্কায় পড়েছেন।
খুটা জেলে আবুল হাসান, দুলাল মাঝি, সাবের মাঝি জানান, গত তিন দিন ধরে তাদের জালে বিপুল পরিমাণ জেলিফিশ ধরা পড়ে। ফলে জাল পাতা যায় না। কেউ কেউ মাছ শিকার বন্ধ রেখেছেন। দীর্ঘ সৈকতের ১৮ কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে মৃত হাজারো জেলিফিশ। কোন কোন জেলে বলছেন জালে আটকা পড়েও এগুলো মারা পড়তে পারে। সৈকতের পশ্চিম দিকটায় বেশি পরিমাণ মৃত জেলিফিশ ভেসে আসছে। সাগরের আন্ধারমানিক মোহনা এলাকায় লেম্বুরচর সৈকতে সবচেয়ে বেশি জেলিফিশ দেখা গেছে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, গত কয়েক দিন থেকে এসব জেলিফিশ উপকূলের কাছাকাছি এসে জেলেদের জালে আটকা পড়েছে। পরে জেলেরা মাছগুলো ফেলে দেয়ায় মরা মাছ কুয়াকাটা সৈকতের বেলাভূমে ভেসে আসছে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে বলে জানান, এ কর্মকর্তা।
সমুদ্র প্রাণি বিশেষজ্ঞ ও পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘জেলি ফিশ সমুদ্রের এক আজব প্রাণি। প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বছর আগের এই প্রাণিকে বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের যুগের প্রাণি হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। জেলি ফিশের মাথা, হৃদপিন্ড, লেজ মেরুদন্ড বা হাত- পা বলে কিছু নেই।
সম্পূর্ণ নরম দেহ বা জিলেটিনাস দেহ নিয়ে এটা গঠিত। বিভিন্ন প্রজাতির জেলিফিস পৃথিবির সকল সাগর, মহাসাগর, হ্রদ বা লেগুনে বিস্তৃত রয়েছে এবং হাজার হাজার বছর ধরে টিকে রয়েছে। জেলি ফিশ প্রকৃতপক্ষে লোনা সাগরের প্রাণি; এরা সাধারনত সাতার কাটার জন্য উপযুক্ত নয় কারন এদের সাতার কাটার কোন দেহশক্তি বা অঙ্গ নেই ; তবে উল্লম্ভ ভাবে সামান্য চলাচলে ভার্টিকেল প্রোপালশন সিস্টেম রয়েছে যার মাধ্যমে পানির গভীর থেকে উপরে এবং উপড় থেকে গভীরে গমন করতে পারে।
পাশ্বীয় চলাচল বা সামন্তরাল পথভ্রমনে এরা মোটেই উপযুক্ত নয়; তাই এরা পাণির স্রোত বা বাতাসের গতির উপর নির্ভরশীল থাকে। জেলি ফিশ সাধারনত উপযুক্ত লবনাক্ততায় প্রজনন করে থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট বয়সে মৃত্যুবরণ করে থাকে। এরা প্রচুর খাবার, সঠিক অক্সিজেন ও লবনাক্ততা পেলে দ্রুত বংশ বিস্তার করে এবং অধিক বংশ গঠনের জন ব্লূমচ ( ইষড়ড়সং) সৃষ্টি করে।
যেহেতু জেলিফিশ সাতার কাটতে পারে না বা স্রোত বা বাতাসে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না তাই এরা সমুদ্রের স্রোত, জোয়ার বা সামদ্রিক বাতাসের ক্রীড়ানক হয়ে পরে এবং বাতাস, স্রোত বা জোয়ারের তোরে সমুদ্র থেকে উপকুলে বা সমুদ্রতীরে বা বিচে এসে আটকে পরে।
স্রোতের বিপরীতে যাবার অক্ষমতার জন্য এখানেই এদের পরিসমাপ্তি হয়ে থাকে। কিছু প্রজাতির জেলিফিশের স্টিং থাকে যেথায় ভেনম বা বিষ থাকে; যদিও এই ভেনম বা বিষ মৃত্য ঝঁুকির মত না হলেও চুলকানি, লাল বার্ণ হয়ে যাওয়া বা কিছু ক্ষেত্রে চোখে লাগলে ক্ষতি করে।
তিনি আরো বলেন, ‘কুয়াকাটার বিচে আটকে পরা জেলিফিশ ” সাদা জেলিফিশ” নামে পরিচিত যার বৈজ্ঞানিক নাম (চযুষষড়ৎযরুধ ঢ়ঁহপঃধঃধ) ফাইলোরিজা পাঙটাটা। এরা মোটেই বিষাক্ত প্রজাতির না এদের স্টিং নেই যেখানে ভেনম বা বিষ থাকতে পারে; তবে এই প্রজাতির জেলিফিশের কিছুটা চুলকানী সৃষ্টি করার ক্ষমতা রয়েছে মাত্র।
প্রতি বছর মার্চ থেকে জুলাই মাসে সমুদ্রের পাণির অক্সিজেন ভালো থাকে, তাপমাত্র অনুকুলে ও লবণাক্ততা প্রজননের জন্য উপযুক্ত হওয়ায় সাদ জেলিফিশ বিস্তরভাবে প্রজনন করে পপুলেশন ব্লুমস তৈরী করে যা পরবর্তীতে সাগরের ঢেউ, স্রোত ও বাতাসের শক্তিতে উপকুলে বা সমিদ্রতীর বা বিচে চলে আসতে বাধ্যে।
এ কারণেই প্রতি বছর মার্চ মাসের শুরুতে বা কিছু ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এসব জেলিফিশ উপকুলে বিস্তৃত হয়ে পড়ে। এসময়ে সাধারনত জেলিফিশের আধিক্যতার কারনে জেলেরা মাছ ধরার কাজে ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তবে তাপমাত্রা কমে গেলে বা সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই এরা মারা যাবে।
কিছু কিছু ক্ষত্রে ধারনা করা হয় যে সাগরে অধিক মাছ আহরন করার ( ওভার ফিশং) কারনেও জেলিফিশের বংশ বৃদ্ধি হতে পারে ; কারণ অনেক সামুদ্রিক মাছ বা প্রাণি জেলি ফিশ খাদ্য হিসেবে গ্রহন করে থাকে। তাই সাগরে কিছু প্রয়োজনীয় মাছ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবে জেলি ফিশের সংখ্যা বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের সাগর সীমায় সরকার যে ৬৫ দিনের জন্য মাছ আহরন নিষিদ্ধ করেছে (২০ মে থেকে ২৩ জুলাই) এ ধারা অব্যাহত থাকলে সাগরের জীব বৈচিত্রতা বৃদ্ধি পাবে এবং মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে জেলেফিশের সংখ্যা বা ব্লুমস প্রাকৃতিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ হবে।
কুয়াকাটা বীচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, মৃত জেলিফিশ অপসারণে মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন।









