মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: চলছিল তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা। স্থানীয়দের ভাষায় বার্ষিক পরীক্ষা। অংক পরীক্ষা দিচ্ছিল চতুর্থ শ্রেণির শাওন তালুকদার, রোল নম্বর-৩, একই ক্লাশের ইয়াসির আরাফাত, রোল নম্বর-১ ও ২ নম্বর রোলধারী সাবিকুন্নাহার। তৃতীয় শ্রেণির রাফি ইসলাম তালুকদার, রোল নম্বর-১ ও দুই নম্বর রোলধারী যুথী তালুকদার। এছাড়া পঞ্চম শ্রেণির হুময়রা আক্তার, রোল-১ ও আরিফা আক্তার, রোল-২। মোট সাতজন। রবিবার (৭ ডিসেম্বর) দুপুরের পরের দৃশ্য এটি ছিল। এই তিন ক্লাশে এবছরের খাতাপত্রের ভর্তি হিসাবে শিক্ষাথর্ী রয়েছে ২৭ জন। পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে মাত্র সাত জন। একইভাবে ওইদিন সকালে প্রথম শ্রেণিতে ৫জন ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৬ জন পরীক্ষা দেয় বলে শিক্ষকরা জানালেন। এই দুই ক্লাশে ভর্তি হওয়া শিক্ষাথর্ীর সংখ্যা ১৫ জন। এভাবে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষাথর্ী সংখ্যা মাত্র ৪২ জন। আর পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ১৮ জন। অনুপস্থিত ২৪ জন। এছাড়া প্রাকপ্রাথমিকেও ১৩জন শিক্ষাথর্ী কাগজে-কলমের হিসাবে রয়েছে। শিক্ষকদের দাবি প্রাকে ৯জন উপস্থিত থাকে। ১৫২ নং উত্তর পূর্ব আনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃশ্য এটি। স্কুলটিতে একটি দ্বিতল ভবন রয়েছে। জানা গেল ১৯৯৪ সালে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা হয়েছে। উপস্থিত শিক্ষকরা জানালেন বিদ্যালয়ে ৬ জন শিক্ষক পদায়ন রয়েছেন। একজন প্রেষণে অন্য স্কুলে চাকরি করছেন। প্রধান শিক্ষক ছাড়া বাকি চার শিক্ষকেই বিদ্যালয়ে পাওয়া গেছে। উপস্থিত শিক্ষকদের (ম্যাডাম) তথ্যমতে একটু আগে জরুরি কাজে প্রধান শিক্ষক বের হয়ে গেছেন। একটা স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম পর্যন্ত উপস্থিত মাত্র ১৮ জন। এই দৃশ্যটি প্রাথমিক শিক্ষার দূরাবস্থার দৃশ্য বলে মনে করছেন সবাই।
একইভাবে দক্ষিণ চাকামইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল ক্লাশ থ্রি থেকে পঞ্চমে ১৮ জন শিক্ষাথর্ী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এই তিন ক্লাশে ভর্তি হওয়া শিক্ষাথর্ী সংখ্যা ২৬ জন। একইভাবে প্রধান শিক্ষকের দেওয়া তথ্যমতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৩ জনের মধ্যে ২১ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এখানে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চমে ভর্তি হওয়া শিক্ষাথর্ী সংখ্যা ৪৯ জন। আর পরীক্ষা দিচ্ছে ৩৯ জন। অনুপস্থিত ১০ জন। এখানে প্রাক প্রাথমিকে রয়েছে ১৬ জন। স্কুলটিতে পাঁচজন শিক্ষক পদায়ন রয়েছে। এই দুই স্কুলের শিক্ষকদের দাবি বিদ্যালয়ের আশপাশে বহু মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকায় শিশুরা ওইখানে গিয়ে পড়া লেখা করছে। আবার কেউ কেউ সংসারের জীবীকার প্রয়োজনে বাবার সঙ্গে কাজ করছেন। কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন করোনার পর থেকে প্রাইমারি পর্যায়ে শিক্ষাথর্ী সংখ্যা কমতে থাকে। এটি আর ঠেকানো যায়নি। কারণ উল্লেখ করে শিক্ষকরা দাবি করেন করোনাকালীন স্কুল বন্ধ ছিল। আর মাদ্রাসা খোলা ছিল। তখন বহু শিশু অন্যত্র চলে গেছে।
কলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সিকদারবাড়ির স্কুল নামেও চেনেন সবাই। সোমবার, ৮ ডিসেম্বর দুপুরে গিয়ে দেখা গেল তৃতীয় প্রান্তিক পর্যায়ের পরীক্ষায় পঞ্চম শ্রেণির ৭ জন, চতুর্থ শ্রেণির ১৫ জন ও তৃতীয় শ্রেণির ১৭ জনে মোট ৩৯ জন অংশ নিয়েছে। ভর্তির হিসেবে এই তিন ক্লাশে শিক্ষাথর্ীও সংখ্যা ৪৬ জন। সকালের শিফটে প্রথম শ্রেণিতে ১২ জন ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫ জনে পরীক্ষা দিয়েছে বলে শিক্ষকরা জানালেন। এই দুই ক্লাশে খাতাপত্রে শিক্ষাথর্ী রয়েছে ২৩ জন। প্রথম থেকে পঞ্চমে ৬৯ জন শিক্ষাথর্ী রয়েছে। যার মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫৬ জন। ১৪ জন অনুপস্থিত। এই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জানালেন প্রাক প্রাথমিকের ১৫ শিশু নিয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষাথর্ী মোট ৮৪ জন। যার ৭১ জন উপস্থিত থাকছে। এখাছে প্রধান শিক্ষকসহ সাতজন শিক্ষকের পদ রয়েছে। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক নেই। ছয় জন শিক্ষক রয়েছেন কর্মরত। শহরের মধ্যেও এই স্কুলটারও শিক্ষাথর্ী সংখ্যা চরম হতাশাব্যঞ্জক। মাদ্রাসাসহ আশপাশের কিন্ডারগার্টেনে চলে গেছে বহু শিশু শিক্ষাথর্ী এমন দাবি শিক্ষকদের।
একইভাবে কাংকুনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গিয়ে প্রথম থেকে পঞ্চমে ১০৭ শিক্ষাথর্ীর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৯০ জন। এখানে শরীফুল নামের এক শিশু ঢাকায় গেছে, শিফা নামের এক শিশু মায়ের সাথে ইটখলায় কাজ করছে, আব্দুল্লাহ নামের এক শিশুও ইটভাটায় কাজ করছে মাদ্রাসা ও অন্য স্কুলে গেছে চারজন। উপস্থিত প্রধান শিক্ষকসহ অন্যরা জানালেন এসব তথ্য। ভরপুর থাকা প্রথম থেকে পঞ্চম পর্যন্ত ২১৭শিক্ষাথর্ীর স্কুল তুলাতলী-১ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৮৪ জন। ৩৩ জন অনুপস্থিত রয়েছে। এরা আর আদৌ স্কুলে ফিরবে কি না তা কেউ নিশ্চিত কওে জানাতে পারেননি শিক্ষকরা।
১৬২ নং বেতকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় প্রথম থেকে পঞ্চম পর্যন্ত ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬৩ জন। গড় উপস্থিতি ৩০-৩১ জন। অর্ধেকের হদিস নেই। এখানে প্রাকপ্রাথমিকে রয়েছে ১৫ শিশু। ২৪ নভেম্বর সকালে পরিদর্শন করে এই দৃশ্য দেখা যায়। এখানে পাঁচজন শিক্ষক পদায়ন রয়েছে।
শিক্ষকদের দাবি আশপাশে ছয়টি মাদ্রাসা রয়েছে। তবে এখানে একাধিক অভিভাবকের অভিযোগ রয়েছে প্রধান শিক্ষক ক্লাশে ঠিকমতো আসেন না। স্থানীয়দের সঙ্গে মামলা বিবাদে জড়িত রয়েছেন। মাদ্রাসায় ভালো লেখাপড়া হয়। স্কুলে তেমনটা হয় না। এমনকি ওই প্রধান শিক্ষক মামলায় হাজিরার দিনেও স্কুলের হাজিরা খাতায় সই করেছেন। এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে ভুল করে সই দিয়েছেন বলেও দাবি প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিনের।
একই দশা ১০৪ বৌলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। এভাবে কলাপাড়ার ১৭২টি বিদ্যালয়ের অন্তত ৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আবার ৫০-৬০জন শিক্ষক রয়েছে যারা স্কুলে ঠিকমতো যায় না। আবার কখনো গেলেও দেরিতে গিয়ে আগে চলে আসেন। কলাপাড়ায় ১৭২টি বিদ্যালয় থেকে ভর্তির হিসাব থেকে অন্তত ২০০০ শিক্ষার্থী তৃতীয় মূল্যায়ন পরীক্ষায় অনুপস্থিত রয়েছে। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় চরম দুরাবস্থা চলছে। এই সংকট কাটাতে কঠোর মনিটরিং দরকার বলে মনে করছেন অভিভাবকসহ সচেতন নাগরিকরা।
তবে অনেক বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক সংকট রয়েছে। যেমন চরচাপলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যেখানে ৩৩৪ জন শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক রয়েছে ৫ জন। অথচ পদ রয়েছে ৮টি। চর গঙ্গামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে ১৫৭ শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক সংখ্যা মাত্র ৩ জন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাহিদা বেগম জানান, তিনি এসব অভিযোগ তদন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন। এমনকি যেসব স্কুলে শিক্ষাথর্ী সংখ্যা নিয়মের চেয়ে কমে গেছে সে ব্যাপারে উর্ধতন কতৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, তিনি সরেজমিন পরিদর্শন কওে বিষয়গুলো অবহিত হয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষার এই সংকট কাটাতে সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কতৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করবেন বলে জানান তিনি।









