মেঘনা ও কীর্তনখোলা নদীবেষ্টিত এলাকাগুলোতে ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও, এর প্রভাব সবচেয়ে নির্মমভাবে পড়েছে উপকূলীয় জেলে পরিবারগুলোর ওপর। বিকল্প উপার্জনের অভাব, সরকারি সহায়তা না পাওয়া এবং নিবন্ধিত ‘জেলে কার্ড’ না থাকার দরুন খাদ্য, পোশাক ও মৌলিক চাহিদা পূরণে ঘোর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন বরিশাল সদর উপজেলার রড ও সিমেন্ট ঘাট সংলগ্ন কর্ণকাঠি জেলে পল্লির জেলেরা।
নদী ও জীবনযাত্রার এই সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালিত ‘Beyond the Shore: Fishermen, Climate Resilience & Employment’ শীর্ষক একটি সামাজিক অনুসন্ধানী প্রকল্পের প্রাথমিক মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, কর্ণকাঠি জেলে পল্লির প্রায় ১০ জন জেলের ওপর পরিচালিত ওই নিবিড় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। যার মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ (৩-৪ জন) জেলেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ‘জেলে কার্ড’ বা সরকারি নিবন্ধন নেই। ফলে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে যে সামান্য সরকারি খাদ্য সহায়তা বা চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা থেকেও বঞ্চিত থাকছেন এই প্রকৃত জেলেরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক জেলে জানান, “আমাগো মূল পরিচয় আমরা জেলে। কিন্তু কাগজের কার্ড না থাকায় বিপদের দিনে কোনো সাহায্য পাই না। পেটে ভাত না থাকলে নদী থাইকা দূরে থাকা আমাগো লাইগা মরণের সমান।”
সামাজিক সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃত জেলেদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে নতুন নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং তালিকা হালনাগাদের দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির জন্য পরিবেশগতভাবে ইতিবাচক হলেও, কোনো বিকল্প সামাজিক নিরাপত্তা না থাকায় জেলেদের জীবনে তা নেমে আসে অভিশাপ হয়ে। নিয়মিত আয় বন্ধ থাকায় দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করা, পরিবারের বস্ত্র ও চিকিৎসার ব্যায়ভার বহন করা তাঁদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
গবেষক দলের তথ্য মতে, সাক্ষাৎকার দেওয়া জেলেদের প্রায় সবাই অভিযোগ করেছেন—নৌকা ও জাল গুটিয়ে রাখার এ সময়ে তাঁরা সরকারি খাদ্য সহায়তা পাননি। এতে তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
নিষেধাজ্ঞার সময় বেকার বসে না থেকে জেলেরা বিকল্প কাজ হিসেবে দিনমজুরি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেও, সেখানে প্রধান বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে শারীরিক সামর্থ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক মূলধনের অভাব। অটোরিকশা কেনা বা দৈনিক ভাড়ায় চালনা করার মতো আর্থিক সঙ্গতি অধিকাংশ জেলেরই নেই।
উল্লেখ্য, এই আশঙ্কাজনক চিত্রটি তুলে এনেছেন একদল তরুণ গবেষক। ‘Beyond the Shore’ অ্যাকশন প্রজেক্টের অধীনে কর্ণকাঠি জেলে পল্লি থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করেন— বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিশকাতুল হোসেন এশা, মো. তানজিম হাসান জিহাদ, মো. আলিফ খান বাপ্পী এবং জাহিন আবদুল্লাহ।
প্রকল্প দলের মূল বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট: “মাছ ও মৎস্যসম্পদ রক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, যারা এই সম্পদের মূল রক্ষক—সেই জেলেদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত করাও রাষ্ট্রের সমান দায়িত্ব।”









