সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার দেওয়া বিশেষ আশ্রয়ণের ঘরটিও হাতছাড়া হয়ে গেছে রাখাইন নারী মাথানের। ঘরটির সামনের দুটি দোকানও এখন আর তাঁর দখলে নেই। একসময় ওই ঘরে বসবাসের পাশাপাশি দোকান দুটি পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। বর্তমানে উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেরানিপাড়া ছেড়ে পাখিয়াপাড়া রাখাইন পল্লিতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন এই নারী।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটার কেরানিপাড়া রাখাইন পল্লির বাসিন্দা মাথান এখন আশ্রয়হারা। ২০০৪ সালের ২ ডিসেম্বর কুয়াকাটা সফরকালে রাখাইনদের দুরবস্থা দেখে তাঁদের জন্য বিশেষ আবাসনের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
ওই নির্দেশনার আলোকে হতদরিদ্র ও দরিদ্র রাখাইনদের জন্য বিশেষ আবাসন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পটুয়াখালী জেলা আশ্রয়ণ প্রকল্প টাস্কফোর্স কমিটি ২০ জনের একটি তালিকা অনুমোদন করে। পরে কলাপাড়া উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুয়াকাটার কেরানিপাড়ায় রাখাইনদের বসতঘরের আদলে ২০টি টংঘর নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে মাথানকে ছয় নম্বর ঘরটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বসবাস করে আসছিলেন তিনি।
মাথানের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তনের পর তাঁর স্বজাতির এক নিকটাত্মীয় তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ওই ঘর থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করেন। প্রথমে এ নিয়ে মামলা করা হয়। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবে তাঁকে উচ্ছেদ করে ওই ঘরে বসবাস শুরু করেন উচু মং নামের এক রাখাইন ব্যক্তি। পরে ঘরটির সামনের দুটি দোকানের ভাড়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়। গত তিন বছর ধরে দোকান দুটির ভাড়া পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ মাথানের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আশ্রয়ণের অধিকাংশ ঘরই রাখাইনদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। অনেকে স্বেচ্ছায় জমিসহ ঘর বিক্রি করেছেন। বর্তমানে সেখানে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক হোটেল। রাখাইন পল্লির পুরোনো ঐতিহ্যও অনেকটা হারিয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাখাইন পল্লির নিজস্ব দেবোত্তর সম্পত্তিও বিক্রি করা হয়েছে।
তবে মাথানের ঘরটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। ঘরটির টিনের চাল পুরোনো হয়ে গেছে। সামনের দুটি দোকানের ভাড়াটিয়াও রয়েছেন। কিন্তু ঘর ও দোকান কোনোটির ওপরই তাঁর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
মাথান জানান, দোকানের ভাড়াটিয়া জয়নাল ও আবু হানিফ আগে তাঁকে ভাড়া দিতেন। কিন্তু বর্তমানে উচু মংয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাঁরা আর তাঁকে ভাড়া দেন না। দোকান দুটির ভাড়া থেকে বঞ্চিত হয়ে তিনি এখন অসহায় জীবনযাপন করছেন।
অভিযুক্ত উচু মং অবশ্য মাথানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, মাথান কখনো ওই ঘরে বসবাস করেননি। ঘর দখলের অভিযোগও সঠিক নয়। দোকানের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অন্যদিকে, দোকানের ভাড়াটিয়া জয়নাল ও আবু হানিফ জানান, তাঁরা আগে মাথানকে দোকানভাড়া দিতেন। বর্তমানে উচু মং দখলে থাকায় তাঁকে ভাড়া দিচ্ছেন।
বর্তমানে নিজের বসতঘর ও দোকান ফিরে পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মাথান। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান পাননি তিনি। কলেজপড়ুয়া সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর। নিজের অধিকার ফিরে পেতে লড়াই করার মতো সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছেন এই অসহায় নারী।
হতাশ কণ্ঠে মাথান বলেন, “বর্তমানে আমি সবার কাছে ঘুরছি। কিন্তু কোনো সমাধান পাচ্ছি না।”
এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাথান বলেন, “উনার (প্রধানমন্ত্রীর) মা আমাকে ঘর দিয়েছেন। কিন্তু সেই ঘরও হাতছাড়া হয়ে গেছে।” নিজের বরাদ্দ পাওয়া আশ্রয়ণের ঘর ও দোকান ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।









