ঠাকুরগাঁও জেলা সদর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে বালিয়া গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক বালিয়া মসজিদ। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে বোদা-পঞ্চগড় যাওয়ার পথে ভুল্লী বাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পূর্বে বালিয়া গ্রামের শাঠবন্দি এলাকায় মসজিদটির অবস্থান। অন্যদিকে, ভুল্লী বাজার থেকে গড়েয়া হাট যাওয়ার পথে তুরুকপথা নামক বাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মসজিদ।
লোকমুখে প্রচলিত নানা কথা
বালিয়া মসজিদটি স্থানীয় জনগণের কাছে ‘জিনের মসজিদ’ নামেই বেশি পরিচিত। এ মসজিদের নির্মাণ ইতিহাস নিয়ে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। অনেকের মতে, কোনো এক অমাবস্যার রাতে জিন-পরীরা বালিয়া গ্রামের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় গ্রামটি তাদের পছন্দ হয়। এরপর জিন-পরীরা মাটিতে নেমে এসে মসজিদ নির্মাণ শুরু করে। কথিত আছে, তারা এক রাতেই মসজিদটি নির্মাণ করেছিল।
জিন-পরীরা সারারাত জেগে মসজিদটি নির্মাণ করে। মসজিদের পুরু দেয়াল ও বিভিন্ন কারুকার্যময় অলংকার তৈরি করতে করতে ভোর হয়ে যায়। ফলে গম্বুজ নির্মাণের কাজ অসমাপ্ত রেখেই তারা চলে যায়। জিন-পরীরা মসজিদটির কিছু অংশ নির্মাণ করেছে—এমন লোকবিশ্বাস থেকেই এটি স্থানীয়দের কাছে ‘জিনের মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।
বর্তমানের বালিয়া মসজিদটি ২০০৫ সালের আগে জঙ্গলে ঢাকা ছিল। স্থানীয়দের কারও কারও মতে, একসময় মসজিদের পুকুরঘাটে বাঘ পানি খেত। পানি খেয়ে পাশের জঙ্গলের একটি বিশাল গর্তে ঢুকে যেত বাঘ। সঙ্গে কয়েকটি বাঘের বাচ্চাও থাকত। ওই জঙ্গলে বাঘের পাশাপাশি অনেক খরগোশও বাস করত বলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।
চৌধুরী পরিবারের সদস্য আহমেদ কবীর তাঁর মামা আইনুদ্দীন আহম্মেদের (৮৬) কাছে এ মসজিদের ইতিহাস সম্পর্কে শুনেছেন। আইনুদ্দীন আহম্মেদ বোদা সরকারি পাইলট মডেল স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মসজিদ নির্মাণ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই প্রধান স্থপতি মারা যান। এর কিছুদিন পর মসজিদের কাজ অসমাপ্ত রেখেই মেহের বকস চৌধুরী মারা যান।
এরপর এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে—মসজিদটি আল্লাহর কাছে কবুল হয়নি, তাই মসজিদ নির্মাণে এত বাধা। ফলে মসজিদটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, মসজিদটির বয়স প্রায় ১০৮ থেকে ১১০ বছর।
২০০৫ সালের আগে মসজিদটি জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল এবং জায়গাটি উঁচু পিরামিড আকৃতির ছিল। মসজিদের পাশেই একটি ছোট ঘর তৈরি করে স্থানীয় মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতেন।
সংস্কারের পর নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়
২০০৫ সালে মসজিদটির সংস্কারকাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় শুরু হয়। মেহের বকস চৌধুরী মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে এটি ‘চৌধুরী মসজিদ’ নামেও পরিচিত। এছাড়া ছোট বালিয়া গ্রামে অবস্থিত হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এটি ‘ছোট বালিয়া মসজিদ’ নামেও পরিচিত।
২০১০ সালে সংস্কারকাজ শেষে উদ্বোধনের সময় এলাকার জনগণের সর্বসম্মতিক্রমে মসজিদটির নাম দেওয়া হয় ‘বালিয়া ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদ’। এরপর থেকে মসজিদটি এ নামেই পরিচিত হয়ে আসছে।
নির্মাণকাল নিয়ে রয়েছে মতবিরোধ
বালিয়া মসজিদ নির্মাণের সাল নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। মসজিদের সামনে নির্মিত স্মৃতিফলকে খোদাই করা আছে—মসজিদটি নির্মাণ করা হয় ১৩১৭ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ ১৯১০ সালে। আবার মসজিদের নির্মাতা মেহের বকস চৌধুরীর কবরে তাঁর মৃত্যুসালও ১৩১৭ বঙ্গাব্দ উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় মানুষ ও মেহের বকস চৌধুরীর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বালিয়া মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। মেহের বকস চৌধুরীর মৃত্যুর সময়, অর্থাৎ ১৯১০ সালে, মসজিদটির বেশিরভাগ কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, মেহের বকস সরকারের পিতা ছিলেন রাজ-এ-মোহাম্মদ। তাঁদের আদি নিবাস ছিল ভারতের বিহারে। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর মেহের বকসের দাদা সপরিবারে বিহার থেকে জলপাইগুড়িতে চলে আসেন। পরে মেহের বকসের বাবা রাজ-এ-মোহাম্মদ ব্যবসার উদ্দেশ্যে তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুরের অন্যতম মহকুমা, বর্তমান ঠাকুরগাঁও এলাকায় আসেন এবং স্থানীয়ভাবে বসবাস শুরু করেন।
রাজ-এ-মোহাম্মদ দ্রুত ব্যবসায় সমৃদ্ধি অর্জন করেন। স্থানীয় জমিদারের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্কের কারণে রাজ-এ-মোহাম্মোদের ছেলে মেহের বকসের সঙ্গে তৎকালীন জমিদার তাঁর কন্যা বিবি গুলমতি নেছার বিয়ে দেন। পরবর্তীতে গুলমতি নেছা তাঁর বাবার মৃত্যুর পর জমিদারির উত্তরাধিকারী হন।
যদিও জমিদারি গুলমতি নেছার নামে ছিল, তবে কার্যত শাসন করতেন মেহের বকস। গুলমতি নেছা ব্রিটিশদের কাছে সময়মতো জমিদারি কর পরিশোধ করায় ‘চৌধুরাণী’ উপাধি লাভ করেন। মেহের বকস সরকারও সে সূত্রে ‘চৌধুরী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, আনুমানিক ১৮৬০ সালের দিকে, জমিদার মেহের বকস চৌধুরী বালিয়া গ্রামে একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তাঁর আগ্রহেই স্ত্রী গুলমতি চৌধুরাণী মসজিদ নির্মাণে এগিয়ে আসেন।
মুঘল স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী নকশা করা এ মসজিদ নির্মাণের জন্য দিল্লি, আগ্রা অথবা মতান্তরে মুর্শিদাবাদ থেকে স্থপতি আনা হয়। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর জটিল নকশায় নির্মিত মসজিদটি তৈরি করা যেমন ব্যয়বহুল ছিল, তেমনি সময়সাপেক্ষও ছিল।
হঠাৎ মসজিদ নির্মাণের প্রধান স্থপতির মৃত্যু হলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে মেহের বকস চৌধুরী স্থানীয় কারিগরদের সহায়তায় মসজিদটির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করেন। তবে স্থানীয় কারিগররা মসজিদের গম্বুজ নির্মাণে ব্যর্থ হন। ১৯১০ সালে মেহের বকস চৌধুরী মারা গেলে আবারও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
মেহের বকসের মৃত্যুর কয়েক বছর পর তাঁর ছোট ছেলে মাসির উদ্দীন চৌধুরী মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু তিনিও নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই মারা যান। ফলে মসজিদটি দীর্ঘ প্রায় ১০০ বছর গম্বুজ ছাড়াই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। ধীরে ধীরে মসজিদের চারপাশ জঙ্গলে পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং একসময় এটি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়।
সংস্কার ও পুনরুদ্ধার
২০০৫ সালে মেহের বকস চৌধুরীর ছেলে বসরত আলী চৌধুরীর কন্যা শিল্পপতি তাসরিফা খাতুনের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় মসজিদটির সংস্কারকাজ শুরু হয়।
গম্বুজের নকশা করেন স্থপতি সৈয়দ আবু সুফিয়ান কুশল। মসজিদটির সংস্কারকাজ তত্ত্বাবধান করেন শিল্পী কামরুজ্জামান স্বাধীন ও জাকিরুল হক চৌধুরী শাহেদ। সংস্কারকাজের সময় প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ফিরোজ এম হাসান।
২০১০ সালে মসজিদটির সংস্কারকাজ শেষ হলে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন
বালিয়া মসজিদের নির্মাণশৈলীতে মুঘল আমলের স্থাপত্যের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদের নির্মাণশৈলী মনোমুগ্ধকর। মসজিদটিতে কোনো পিলার নেই।
মসজিদটি সমতল ভূমি থেকে পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর অবস্থিত। এর পূর্ব-পশ্চিমে ৬২ ফুট ছয় ইঞ্চি এবং উত্তর-দক্ষিণে ৬৯ ফুট দুই ইঞ্চি আয়তাকার কমপ্লেক্স রয়েছে। মূল ভবনটি পূর্ব-পশ্চিমে ২৫ ফুট ১১ ইঞ্চি প্রশস্ত। প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাদের উচ্চতা ১৭ ফুট। মসজিদের প্রধান ফটকের দৈর্ঘ্য ২১ ফুট এবং প্রস্থ ৯ ফুট। বিশাল আকৃতির কারুকার্যমণ্ডিত সদর দরজাটি মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ।
মসজিদের ছাদে একই আকারের তিনটি গম্বুজ ও আটটি মিনার রয়েছে। ছাদের চার কোণে অবস্থিত চারটি মিনার আকারে বড়, আর বাকি চারটি মিনার তুলনামূলক ছোট।
ভিত্তিসহ পুরো মসজিদটি হাতে পোড়ানো ইট এবং চুন-সুরকির মর্টার দিয়ে তৈরি। মসজিদের ইটের গায়ে আলাদা কোনো কাজ না থাকলেও দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ইট কেটে ফুল, কলস, ডিশ, ঘণ্টা, বাটি, আমলকীসহ বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয়েছে।
আয়তাকার কমপ্লেক্সটি সিঁড়িসহ প্রবেশপথ, খোলা চত্বর ও মূল ভবন বা নামাজঘর—এই তিনটি অংশে বিভক্ত। মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য তিনটি দরজা রয়েছে। প্রতিটি দরজার ওপর খোদাই করে ‘হিজরি ১৩২৭ সাল’ লেখা রয়েছে।
মসজিদের পশ্চিম পাশে একটি ছোট জানালা এবং উত্তর ও দক্ষিণ পাশে একটি করে জানালা রয়েছে। মসজিদের ভেতরে তিনটি কাতারে প্রায় ৩০০ জন একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক
ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রত্নতত্ত্ব। যেকোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের সমসাময়িক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে জানা যায় কোনো এলাকার মানুষের জীবনযাপনের ধারা, আচার-ব্যবহার, পেশা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্গত বর্তমান ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তুলনামূলকভাবে কম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি নিদর্শন হলো বালিয়া ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদ।
মেহের বকস চৌধুরীর শাসনামলে বালিয়ার যে জৌলুস ছিল, তা কালের বিবর্তনে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবে বালিয়ার চৌধুরী পরিবারের এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদ আজও তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।









