সুন্দরবনে দীর্ঘদিনের ত্রাস সৃষ্টিকারী ৪টি বনদস্যু বাহিনীর ৫২ জন সদস্য র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। যা উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বনজীবীদের জীবিকার জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোমবার ( ৩১ আগস্ট ) চারটি সক্রিয় বনদস্যু বাহিনীর ৫২ জন সদস্য র্যাবের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেছেন।
র্যাব-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আত্মসমর্পণকারী বাহিনীর মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনারুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন এবং আফতাব বাহিনীর ৮ জন সদস্য রয়েছেন। চার বাহিনীর প্রধানসহ এই বিপুল সংখ্যক দস্যুর অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ সুন্দরবনের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি এবং ধারাবাহিক অভিযানের মুখে পড়ে দস্যু জীবনের অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই আত্মসমর্পণ সুন্দরবনের অপরাধ দমনে র্যাবের কৌশলগত সক্ষমতারই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল হাজারো জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়াল বছরের পর বছর ধরে এই দস্যু বাহিনীর অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিলেন।
ভুক্তভোগী বনজীবীদের অভিযোগ, দস্যুদের অত্যাচারে অনেক সময় তারা বনে প্রবেশ করতে ভয় পেতেন, যার ফলে তাদের পরিবারগুলোর আয়ের উৎস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বনের গহীনে তাদের আধিপত্যের কারণে সাধারণ মানুষ জিম্মি অবস্থায় দিনাতিপাত করতেন। অপরাধ জগতের এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা দস্যুদের অনেকেরই ভাষ্যমতে, বন ও প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ বেছে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। দীর্ঘদিনের এই ভীতি ও অনিশ্চয়তা নিরসনে বনজীবীরা এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, দস্যুতার এই বিষবৃক্ষ পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে দীর্ঘমেয়াদী নজরদারি ও সামাজিক পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
র্যাব-৬-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আত্মসমর্পণকারী এই ৫২ জনের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং পরবর্তীতে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হবে। অতীতে আত্মসমর্পণকারী অনেক দস্যুর পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এবার কেবল আত্মসমর্পণ নয়, বরং তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
একইসঙ্গে বনদস্যুতা নির্মূলে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া পুনর্বাসন উদ্যোগগুলো আরও জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
র্যাবের ভাষ্যমতে, দস্যুদের এই সাংগঠনিক সক্ষমতা কমে আসায় বনের ভেতর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো হবে।
এদিকে, দীর্ঘ তিন মাস বন্ধ থাকার পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় সুন্দরবনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পর্যটন মৌসুমের শুরুর দিনেই দস্যু বাহিনীর এই আত্মসমর্পণ সুন্দরবনের নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কেবল আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই সুন্দরবনকে শতভাগ দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অপরাধীদের পুনরায় মূলধারায় ফিরিয়ে আনা এবং বনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সুন্দরবন অঞ্চলে দস্যুতাবিরোধী লড়াইয়ে প্রশাসন একটি বড় বিজয় অর্জন করলেও, ভবিষ্যতে যেন নতুন কোনো দস্যুচক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।








