শরতের পূর্ণিমা। গ্রামের আকাশে গোল চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় পুকুরের পানি যেন রুপার থালার মতো ঝিকমিক করছে। দূরের বাঁশঝাড় থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। চারপাশে এক অদ্ভুত শান্তি।
কিন্তু গ্রামের মাঝের পুরোনো বটতলার আজ কোনো ঘুম নেই।
সন্ধ্যা নামার পর থেকেই সেখানে লোকজন জড়ো হতে শুরু করেছে। কেউ চাটাই বিছাচ্ছে, কেউ কুপি বাতি জ্বালাচ্ছে। গ্রামের কিশোরেরা দৌড়ে বেড়াচ্ছে, আর বয়স্করা বসে পুরোনো দিনের গল্পে মেতে উঠেছে।
আজ বহু বছর পর বসেছে পুঁথি পাঠের আসর।
বটগাছের নিচে একটি পিঁড়িতে বসেছেন গ্রামের সবার প্রিয় মানুষ হাশেম আলী। বয়স সত্তর পেরিয়েছে, কিন্তু কণ্ঠ এখনো বেশ জোরালো। সামনে রাখা পুরোনো কাপড়ে মোড়ানো কয়েকটি পুঁথি। পাশে বসেছেন করিম বাউল, হাতে দোতারা।
হাশেম আলী পুঁথির পাতা খুলতেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
—“শুনেন সবাই, আজকের কাহিনি কিন্তু একেবারে পুরোনো দিনের…”
কথা শেষ হতেই পাশে বসা ছোট্ট রাকিব বলে উঠল,
—“চাচা, গল্পে ভূত আছে?”
চারদিক থেকে হাসির শব্দ উঠল।
হাশেম আলী চোখ বড় বড় করে বললেন,
—“ভূত আছে কি না, সেটা শেষে বুঝবা। আগে মন দিয়া শোন!”
আবার হাসির রোল পড়ে গেল।
এরপর শুরু হলো পুঁথি পাঠ। তাঁর কণ্ঠে কখনো রাজা-বাদশাহর গল্প, কখনো প্রেম-বিরহের কাহিনি, কখনো আবার বীরত্বের ঘটনা। করিম বাউলের দোতারার টুংটাং শব্দে গল্প যেন আরও জীবন্ত হয়ে উঠল।
বৃদ্ধ রহিম চাচা চোখ বন্ধ করে শুনছিলেন। হঠাৎ তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—“আহা! ছোটবেলায় এমন আসর কত দেখছি! তখন তো রাত কইরা মানুষ পুঁথি শুনত।”
পাশে বসা কলেজপড়ুয়া সুমন অবাক হয়ে জানতে চাইল,
—“চাচা, তখন টেলিভিশন ছিল না?”
রহিম চাচা হেসে বললেন,
—“টেলিভিশন? আমাদের টেলিভিশন আছিল এই পুঁথি আর গল্পের আসর!”
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।
এদিকে গ্রামের মায়েরা উঠানের এক পাশে বসে পুঁথি শুনছেন। কয়েকজন শিশু মায়ের আঁচল ধরে বসে আছে। কিশোরদের কেউ মোবাইল হাতে ছবি তুলতে গিয়ে আবার গল্পে মগ্ন হয়ে পড়েছে।
একসময় হাশেম আলী এমন একটি মজার ঘটনা পড়তে শুরু করলেন যে সবাই হেসে কুটিকুটি। করিম বাউলও দোতারার তারে এমনভাবে ঝংকার তুললেন যে হাসির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠল পুরো আসর।
চাঁদ তখন মাথার ঠিক ওপরে।
কুপি বাতির হলুদ আলো আর পূর্ণিমার সাদা আলো মিলে বটতলার পরিবেশটাকে যেন স্বপ্নের মতো করে তুলেছে।
গল্প শেষ হওয়ার পর হাশেম আলী পুঁথিটি ধীরে ধীরে গুটিয়ে রাখলেন।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর ছোট্ট রাকিব হাততালি দিয়ে বলল,
—“চাচা, কালকেও পুঁথি পড়বেন?”
হাশেম আলী মুচকি হেসে বললেন,
—“কাল না হয় আবার বসুম। তবে শর্ত আছে।”
রাকিব তাড়াতাড়ি বলল,
—“কী শর্ত?”
—“তুই আর তোর বন্ধুরা কাল সময়মতো আসবি। আর মোবাইলটা কিছুক্ষণ দূরে রাখবি!”
রাকিব মাথা নাড়ল।
—“ঠিক আছে। কিন্তু ভূতের গল্প পড়তে হবে!”
আবারও হাসিতে ভরে উঠল বটতলা।
সেদিন রাতে কেউ শুধু একটি গল্প শুনে বাড়ি ফেরেনি। সঙ্গে করে নিয়ে গেছে বাংলার পুরোনো এক ঐতিহ্যের উষ্ণতা। প্রবীণরা ফিরে পেয়েছেন শৈশবের স্মৃতি, আর নতুন প্রজন্ম পেয়েছে মাটির কাছাকাছি থাকা এক আনন্দের নতুন স্বাদ।
পূর্ণিমার আলোয় ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল বটতলা। কুপি বাতিগুলো একে একে নিভে গেল।
শুধু বটগাছের নিচে পড়ে রইল পুঁথির পাতার সেই মায়াবী গল্প—পরের আসরের অপেক্ষায়।



