বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় জলাঞ্চল ঘিরে ইজারার নামে চলছে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে। বন বিভাগের অনুমতিপত্র বা বিএলসির (বনজ সম্পদ আহরণের অনুমতিপত্র) আড়ালে চর, খাল, নদীর মোহনা ও সাগরের বিভিন্ন জলাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে জেলেদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, নির্ধারিত টাকা পরিশোধ না করলে অনেক এলাকায় মাছ ধরতে দেওয়া হয় না। কেউ অনুমতি ছাড়া মাছ ধরতে গেলে মামলা ও হয়রানির ভয় দেখানো হয়। ফলে উপকূলের সাধারণ জেলেরা এক ধরনের ‘জলজমিদারি’র কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। টাকা দিতে না পেরে অনেকে মাছ ধরা ছেড়ে পেশা পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন।
তুফানিয়া চর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের একটি মোহনা বন বিভাগের কাছ থেকে ইজারা নেওয়ার দাবি করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালী মোশাররফ হোসেন। সেখানে মাছ ধরার জন্য জেলে জাকির মাঝি ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানান।
জাকির মাঝি বলেন, প্রতি বৈশাখে লাখ লাখ টাকা দিয়ে এক বছরের জন্য চরটি নেওয়া হয়। ওই সময়ের মধ্যে অন্য কোনো জেলে সেখানে মাছ ধরতে পারেন না বলেও দাবি করেন তিনি।
শুধু তুফানিয়া চর নয়, রাঙ্গাবালীর সোনারচর, চরহেয়ার, চর কাশেম, জাহাজমারা, মায়ার চর, গ্যাপের চর, তালেবের চরসহ উপকূলের বিভিন্ন চর, ডুবোচর ও নদীর মোহনা ঘিরেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
৫ হাজার টাকার অনুমতিতে লাখ লাখ টাকার লেনদেন!
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে বন বিভাগের বিএলসি বা অনুমতিপত্র। জেলেদের দাবি, বন বিভাগের আওতাধীন খাল ও জলাঞ্চলে মাছ ধরার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের অনুমতি দেওয়া হলেও তারা পরে আশপাশের বিশাল জলাঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।
জেলেদের অভিযোগ, বিট অফিসার ও বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে অনুমতি নিতে হয়। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে টাকা দিয়ে সেই অনুমতি সংগ্রহ করতে হয়। টাকা দিতে না পারলে মাছ ধরার সুযোগ মেলে না।
সম্প্রতি মাছ ধরার অনুমতি দেওয়ার কথা বলে শতাধিক জেলের কাছ থেকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে রাঙ্গাবালীর মৌডুবী বিট কর্মকর্তা শোয়েব খানের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর তাকে বদলি করা হলে টাকা ফেরত ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তুফানিয়া চরে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়ার কথা বলে জেলেদের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। টাকা না দিলে বনে প্রবেশ করে মাছ ধরলে মামলা দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাদের।
বন কর্মকর্তার দাবি, ‘পারমিট দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে অভিযুক্ত বন কর্মকর্তা শোয়েব খান ক্যামেরা দেখে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি দাবি করেন, রাজস্ব আদায়ের বিনিময়ে সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা বন বিভাগের রয়েছে।
তিনি বলেন, আবেদন সাপেক্ষে রাজস্ব আদায়ের বিনিময়ে পারমিট দেওয়া হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। একেকটি চরে মাছ ধরার অনুমতিপত্রের বিপরীতে সরকারি রাজস্ব হিসেবে মাত্র ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও এর আড়ালে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের প্রধান সহকারী আনোয়ার হোসেন বলেন, মাছের চরকে কেন্দ্র করে এ ধরনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
সমুদ্র ইজারা দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই: জেলা প্রশাসক
তবে বন বিভাগের অনুমতি বা ইজারার নামে বঙ্গোপসাগরের জলসীমা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী।
তিনি বলেন, সমুদ্র, নদী কিংবা খাল ইজারা দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। সমুদ্র সবার জন্য উন্মুক্ত। আইন মেনে প্রকৃত জেলেরা সেখানে মাছ আহরণ করতে পারবেন। অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহিদুর রহমান বলেন, বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন সীমিত এলাকার বাইরে পুরো সমুদ্র দখল বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
রাজস্ব যায় সামান্য, বাণিজ্য কোটি টাকার অভিযোগ
রাঙ্গাবালীর উপকূলে ৩০টির বেশি চর ও ডুবোচর রয়েছে। এসব এলাকার বিএলসির মাধ্যমে বন বিভাগ প্রতিবছর মাত্র আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা রাজস্ব আদায় করে। অথচ এসব জলাঞ্চল নিয়ন্ত্রণের নামে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি রাজস্ব যদি কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকা হয়, তাহলে একই জলাঞ্চলে জেলেদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে কীভাবে?
উপকূলের জেলেদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কথিত ‘ইজারা সিন্ডিকেট’ বন্ধ করে সমুদ্র ও জলাঞ্চলে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অবাধে মাছ ধরার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।









