নারী মুক্তির আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত, শক্তিশালী ও সমন্বিত করার প্রত্যয়ে খুলনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘নারী মুক্তির আন্দোলন বিস্তৃতিকরণ’ শীর্ষক দ্বিতীয় বিভাগীয় সম্মেলন। ২০ থেকে ২২ আগস্ট তিন দিনব্যাপী খুলনার সিএসএস আভা সেন্টারে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
নারীপক্ষ’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা থেকে তৃণমূল নারী সংগঠনের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, তরুণ নারী, সাংস্কৃতিক কর্মী, শ্রমিক নেত্রী, যৌনকর্মী আন্দোলনের নেত্রী এবং রাজনৈতিক দলের নারী নেতৃবৃন্দসহ প্রায় ৮৬ জন অংশগ্রহণ করেন।
সম্মেলনের প্রথম দিন উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন নারীপক্ষ’র সভানেত্রী কে. এ. জাহান রুমী। সম্মেলনের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন নারীপক্ষ’র সদস্য ফেরদৌসী আখতার। নারীপক্ষ’র আন্দোলন সম্পাদক ও বিভাগীয় সম্মেলনের সমন্বয়কারী গীতা দাসের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী প্ল্যানারি আলোচনায় বক্তব্য রাখেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সারা মনামী হোসেন, দুর্বার নেত্রী শরীফা খাতুন, তরুণ নারী নেত্রী ডোরা দত্ত এবং নারীপক্ষ’র সদস্য অর্চনা বিশ্বাস।
আলোচনায় জনজীবন, মূলধারার গণমাধ্যম ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে কীভাবে দোষারোপ ও বৈষম্যের শিকার হন, তা উঠে আসে। এ সময় সাম্প্রতিক ‘পিংক বাস’ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার উদাহরণ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, ভাষা ও সামাজিক মনোভাবের মাধ্যমেও নারীর ওপর সহিংসতা সংঘটিত হতে পারে। প্রথম দিনের শেষে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, খুলনার পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ‘সহিংসতামুক্ত নারীর জীবন’ শীর্ষক প্ল্যানারি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। কামরুন নাহারের নেতৃত্বে এ অধিবেশনে সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের ভূমিকা, ব্যক্তিজীবন ও জনপরিসর এবং সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পরে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা ও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ব্যক্তিজীবন, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং জনপরিসরে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে করণীয় নিয়েও আলোচনা হয়। দলীয় আলোচনার সারমর্ম উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আলোচিত সমস্যাগুলোর সমাধানে বিভিন্ন করণীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব উঠে আসে।
সম্মেলনের তৃতীয় দিন ‘জীবনের অধিকার’ বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। গীতা দাসের সঞ্চালনায় এ অধিবেশনে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের দাবিও উঠে আসে।
পরে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা করেন কমিশনের সদস্য সুমাইয়া ইসলাম ও কামরুন নাহার। প্রতিবেদনের ৪৩৩টি সুপারিশের মধ্য থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীরা স্থানীয় পর্যায়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কোন কোন সুপারিশ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবেন, তা নির্ধারণ করেন।
এ সময় সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের বাংলাদেশ রিফর্ম ট্র্যাকার সম্পর্কে অবহিত করা হয়। এর মাধ্যমে নারীরা অনলাইনে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে নিজেদের মতামত দিতে পারবেন। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান অনলাইনে এ অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন।
সমাপনী পর্বে অংশগ্রহণকারীদের মতামত গ্রহণ ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়। একই সঙ্গে খুলনা বিভাগে নারী মুক্তির আন্দোলনকে আরও সমন্বিত ও বেগবান করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন নারীপক্ষ’র সদস্য জাহানারা খাতুন। নারী মুক্তির আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায় থেকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এ বিভাগীয় সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।









