পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের বিস্তার। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদ—বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্যের বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ইয়াবার বিস্তারই সবচেয়ে বেশি। মাদকের সহজলভ্যতায় কিশোর, তরুণ ও যুবসমাজকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, কলাপাড়ায় মাদকের বাণিজ্যিক বিস্তার শুরু হয় মূলত ২০১৭ সালের দিকে। কক্সবাজার-কুয়াকাটা নৌপথে ইয়াবার বড় বড় চালান আসার পর স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালান আটক হলেও এসব চালানের সঙ্গে জড়িত মূল হোতা ও পৃষ্ঠপোষকদের অনেকেই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে অভিযোগ রয়েছে।
৬ লাখ ৭৭ হাজার ইয়াবার চালান আটক
২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর কলাপাড়ায় ইয়াবার অন্যতম বড় চালান আটক করে র্যাব। সাগরপথে মিয়ানমার থেকে কুয়াকাটায় আসা ওই চালানটি আন্ধারমানিক সেতুর টোলপ্লাজা সংলগ্ন এলাকা থেকে একটি প্রাইভেটকারসহ জব্দ করা হয়।
র্যাবের এজাহার অনুযায়ী, দুটি কর্কশিটের বক্সে ৩ হাজার ৩৮৫ প্যাকেটে মোট ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৫৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। যার আনুমানিক মূল্য ছিল ২০ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এ সময় বিদেশি পিস্তল, গুলি ও মোবাইল ফোনসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে এ ঘটনায় কলাপাড়া থানায় পৃথক মামলা হয়।
মামলার এজাহারে ইয়াবার চালানটি মিয়ানমার থেকে কুয়াকাটা রুটে আনার কথা উল্লেখ করা হয়। এ কাজে ট্রলার ব্যবহারের তথ্যও উঠে আসে। বিভিন্ন সময়ে এ রুটে আরও ইয়াবার চালান খালাশের তথ্য পাওয়া গেলেও বড় চালানের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২০২৫ সালে ৪ লাখ ইয়াবা উদ্ধার
বড় চালান আটকের পরও বন্ধ হয়নি নৌপথে ইয়াবা পাচার। ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে কক্সবাজার থেকে সাগরপথে কুয়াকাটায় আসা ৪ লাখ পিস ইয়াবার একটি চালান আটক করে র্যাব ও কোস্টগার্ডের যৌথ দল।
আন্ধারমানিক নদীর মোহনার লেম্বুরচর এলাকা থেকে এফবি মায়ের দোয়া নামের একটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়। এ সময় ১৬ জেলেকে আটক করা হয়। আটক জেলেদের অধিকাংশের বাড়ি কক্সবাজারে এবং ট্রলারটির মালিকও কক্সবাজারের বাসিন্দা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
নজরদারি বাড়ায় রুট বদলের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে উৎপাদিত ইয়াবা ছোট নৌযানে বঙ্গোপসাগরে এনে গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশি মাছ ধরার ট্রলারে হস্তান্তর করা হয়। পরে কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও বাঁশখালী উপকূল হয়ে এসব চালান কুয়াকাটার দিকে আনা হয়।
কক্সবাজার-টেকনাফ এলাকায় নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা তুলনামূলক কম নজরদারির কুয়াকাটা-কলাপাড়া উপকূলকে ব্যবহার করছে বলে সূত্রের দাবি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, সমুদ্রে অসংখ্য মাছ ধরার ট্রলারের মধ্যে কোনটিতে মাদকের চালান রয়েছে তা শনাক্ত করা কঠিন। পাশাপাশি উপকূলে ছোট-বড় অসংখ্য মাছঘাট থাকায় কোন ঘাটে চালান খালাশ হচ্ছে, সেটিও সবসময় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে সমুদ্রপথে মাদক পাচার ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সিন্ডিকেট জড়িত থাকার অভিযোগ
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের পাচারচক্রের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থানীয় মাদক কারবারি, ট্রলার মালিক ও মাঝিদের একটি অংশের যোগসাজশ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের বহনকারী বা ক্যারিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে। আলীপুর মৎস্যবন্দরেও কয়েকজন রোহিঙ্গার মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
তবে মাদক এখন শুধু নৌপথেই নয়, সড়কপথেও কলাপাড়ায় প্রবেশ করছে। সর্বশেষ লেবুখালীর পায়রা সেতুর টোলপয়েন্টে কলাপাড়াগামী একটি চালান থেকে ১ হাজার ৬১০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুমকী থানায় মামলা হয়েছে।
বেড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ ও প্রশাসনের মাদকবিরোধী তৎপরতা বেড়েছে। মহিপুর থানার ওসি মো. শামীম হাওলাদার জানান, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মাদক সংক্রান্ত ৭৫টি মামলা হয়েছে।
কলাপাড়া থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে মাদক সংক্রান্ত আটটি মামলা হয়েছে। মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে মূল হোতা পর্যন্ত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৮৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও ধ্বংসের পাশাপাশি মাদক সেবনের দায়ে অনেককে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
গডফাদারদের আইনের আওতায় আনার দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকবিরোধী অভিযানে খুচরা বিক্রেতা ও বাহকরা গ্রেপ্তার হলেও নেপথ্যের অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও মূল হোতাদের অনেকেই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে মাদকের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়।
মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন বন্ধে নৌপথে চালান সরবরাহকারী সিন্ডিকেট, অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও গডফাদারদের শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।









