পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মাধ্যমিক শিক্ষায় ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর দশম শ্রেণিতে পৌঁছানোর আগেই ঝরে পড়ছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। উপজেলার ২৭টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০২৬ সালে দশম শ্রেণিতে পৌঁছেছে মাত্র ৬৬ দশমিক ০৮ শতাংশ। অর্থাৎ ঝরে পড়েছে ৩৩ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এ হার ৫০ শতাংশেরও বেশি।
বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে কলাপাড়ার ২৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে মোট শিক্ষার্থী ছিল ২ হাজার ৩০৮ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১ হাজার ১৪২ এবং ছাত্রী ১ হাজার ১৬৬ জন। চার বছর পর এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০২৬ সালে দশম শ্রেণিতে রয়েছে ১ হাজার ৫২৫ জন। কমেছে ৭৮৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৩৯৪ ও ছাত্রী ৩৮৯ জন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, অভিভাবকদের অসচেতনতা, মাদক ও বখাটেপনা শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান না হওয়া, শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে প্রাইভেট কোচিংয়ের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতার অভিযোগও রয়েছে।
কোনো কোনো বিদ্যালয়ে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে
কলাপাড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত খেপুপাড়া মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ২৯৮ জন। বর্তমানে দশম শ্রেণিতে রয়েছে ১৫২ জন। অর্থাৎ ঝরে পড়েছে ১৪৬ জন বা ৪৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
লালুয়া সুরাতখান জয়েন বিবি (এসকেজেবি) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিল ৫১ জন। বর্তমানে দশম শ্রেণিতে রয়েছে মাত্র ২১ জন। ঝরে পড়েছে ৩০ জন, যার হার ৫৮ দশমিক ৮২ শতাংশ।
তেগাছিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে দশম শ্রেণিতে রয়েছে ৩৬ জন। ঝরে পড়েছে ২৪ জন বা ৪০ শতাংশ।
তুলাতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৫৫ জনের মধ্যে বর্তমানে দশম শ্রেণিতে রয়েছে ২৯ জন। ঝরে পড়েছে ২৬ জন বা ৪৭ দশমিক ২৭ শতাংশ।
হাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৭০ জন শিক্ষার্থী ছিল। বর্তমানে দশম শ্রেণিতে রয়েছে মাত্র ৩০ জন। ঝরে পড়েছে ৪০ জন, অর্থাৎ ৫৭ শতাংশের বেশি।
মধ্য টিয়াখালী আলহাজ কেরামত হাওলাদার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিল ৬৬ জন। বর্তমানে দশম শ্রেণিতে রয়েছে ৩০ জন। ঝরে পড়েছে ৩৬ জন বা ৫৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
চরচাপলী ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ১২৮ জন। বর্তমানে দশম শ্রেণিতে রয়েছে ৭২ জন। ঝরে পড়েছে ৫৬ জন।
এদিকে খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৪৮ জন থেকে কমে বর্তমানে শিক্ষার্থী দাঁড়িয়েছে ১০০ জন। ধানখালী সোনাগাজী হায়াতুন্নেছা অ্যান্ড আশরাফ একাডেমিতে ১০০ জন থেকে কমে ৬০ জন, উত্তরপূর্ব পটুয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬৫ জন থেকে ৪০ জন এবং মহিপুর কো-অপারেটিভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৭৩ জন থেকে কমে ১২৭ জন হয়েছে।
বাল্যবিয়ের কারণে ঝরে পড়ছে মেয়েরা
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সহপাঠীদের অনেকেই ইতোমধ্যে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। তাদের মধ্যে মেয়েদের বড় একটি অংশের বিয়ে হয়ে গেছে। কেউ কেউ সন্তান নিয়ে সংসার করছেন। অন্যদিকে অনেক ছেলে পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় শ্রমজীবী কাজে যুক্ত হয়েছে।
লালুয়া জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা জানান, তার কয়েকজন সহপাঠী পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। তাদের মধ্যে মেয়েদের অনেকের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেদের কয়েকজন শ্রমজীবী কাজে যুক্ত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাদকাসক্তি ও বখাটেপনার কারণে বিদ্যালয়ে যাতায়াত নিয়েও বিশেষ করে ছাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা রয়েছে। এ কারণে অনেক অভিভাবক মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন।
শিক্ষকদের পাঠদান নিয়েও অভিযোগ
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে শুধু দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়েই দায়ী নয়। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান হয় না। কোনো কোনো শিক্ষক নির্ধারিত সময়ের পরে বিদ্যালয়ে আসেন এবং আগেই চলে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পাঠদান না করে কিছু শিক্ষক প্রাইভেট ও বাণিজ্যিক কোচিংয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে দরিদ্র শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে কোচিং করতে না পারায় পাঠদানে পিছিয়ে পড়ছে।
শিক্ষকদের বক্তব্য
খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহসিন রেজা বলেন, মূলত বাল্যবিয়ের কারণে তাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। অভিভাবকদের অসচেতনতাও এর অন্যতম কারণ।
চরচাপলী ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গাজী আলী আহমেদ বলেন, ছেলেদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ এবং মেয়েদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়ের কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে। করোনাকাল থেকে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কলাপাড়া উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. মনিরুজ্জামান খান বলেন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে কাজ চলছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষার সংকট উত্তরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা, বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতা ও আইনি প্রতিকারের পাশাপাশি অভিভাবকদের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
২৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, কলাপাড়ায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর প্রায় একজন দশম শ্রেণিতে পৌঁছানোর আগেই শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে। ফলে মাধ্যমিক শিক্ষার এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর নজরদারি, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।









