পটুয়াখালীর কুয়াকাটা ও সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর উপকূলে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের আহরণক্ষেত্র এখন অনেকটাই ট্রলিং বোটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ স্থানীয় জেলেদের। এতে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জেলে পেশা এবং এ পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাজারো পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় জেলেদের দাবি, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও রূপান্তরিত ট্রলিং বোটগুলো নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছের পোনা, ডিমওয়ালা মাছ, কাঁকড়া ও চিংড়ির পোনা শিকার করছে। ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং মাছের প্রজনন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে ইলিশসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের উৎপাদনে।
জেলে নেতাদের মতে, কলাপাড়া উপকূলের অর্ধলক্ষাধিক জেলে এবং তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আড়তদার, ট্রলার মালিক, শ্রমিক, বরফকল শ্রমিকসহ প্রায় ৮০ হাজার পরিবার বর্তমানে চরম সংকটের মধ্যে রয়েছে। মাছের সংকটে অনেক জেলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, কেউ কেউ পেশা পরিবর্তন করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছেন।
কলাপাড়া ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম মৃধা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ট্রলিংয়ের কারণে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে। এতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে।
জেলেদের অভিযোগ, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রচলিত আইন উপেক্ষা করে কুয়াকাটা, মহিপুর, আলীপুর ও আশপাশের সমুদ্র এলাকায় অবাধে চলছে এসব ট্রলিং বোটের কার্যক্রম। অনেক ক্ষেত্রে ছোট জেলেদের জাল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রতিবাদ করলে প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্যানুযায়ী, মহিপুর-আলীপুর এলাকায় গত বছর যেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় ছিল, সেখানে চলতি বছর এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। দ্রুত লাভের আশায় সাধারণ কাঠের মাছধরা ট্রলারকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে এবং এসব নৌযানে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক দূষণের পাশাপাশি অবৈধ ট্রলিং এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এতে শুধু জীববৈচিত্র্যই নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী জানান, অবৈধ ট্রলিং বন্ধে কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে অভিযান ও নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
উপকূলের পরিবেশকর্মী ও জেলেদের দাবি, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় মাছের ভাণ্ডার এবং জেলেদের জীবন-জীবিকা আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে।









