গলাচিপা প্রতিনিধি: পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ প্রেক্ষিতে গলাচিপা উপজেলা বিএনপি হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করা হয়েছে পরাজিত প্রার্থী অপপ্রচার করছেন। অন্যদিকে নুরুল হক নুর নেতাকর্মী সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি সমর্থিত ও গণঅধিকার পরিষদের ‘ট্রাক’ প্রতীকের প্রার্থী নুরুল হক নুর বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপি থেকে বহিস্কৃত কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ‘ঘোড়া’ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন। নির্বাচন কালীন দুই প্রার্থীর নেতাকর্মী সমর্থকদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। যা নিয়ে দুপক্ষের থানায় অন্তত ৫ টি মামলা হয়েছে।
নির্বাচন পরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে হাসান মামুন তার ফেইসবুক আইডিতে পোস্ট করে একাধিক অভিযোগ করেছেন। গত শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে তিনি একাধিক পোস্ট করেন যাতে উল্লেখ করেন- চরবিশ্বাস হাজী কেরামত আলী ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোলাইমান, চরবিশ্বাস ৬ নং ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি জুলাইযোদ্বা মাহমুদুল হাসান, চরবিশ্বাস ইউনিয়ন সেচ্ছাসেবক দলের সদস্য তামীম ও ৬ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বাপ্পি, রতনদী তালতলীর উলানিয়া বন্দরে বিএনপি কর্মী ইমন, সজিব, দশমিনা উপজেলার রনগোপালদী ইউনিয়ন যুবদল নেতা রিপন, বেতাগী শানকিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল সদস্য মো. সাগর মাতব্বর, সোহাগ, সুজন ও গলাচিপা উপজেলার বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহীনের উপর হামলা করা হয়েছে। এতে তিনি গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের অভিযুক্ত করেন।
হাসান মামুন আরও দাবি করেন দশমিনা ও গলাচিপার চরকাজল, ডাকুয়া, চিকনিকান্দিসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে, বিএনপির পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, এটা দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, যারা বিএনপি নেতাকর্মীদের উপর হামলা পরিচালনা করছেন, তারা প্রায় শতভাগই আওয়ামী লীগ থেকে কনভার্টেড গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মী।
পরবর্তীতে শনিবার রাতে হাসান মামুন আরেকটি পোস্ট করে বলেন, শান্তির জনপদ থেকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারন্য- গলাচিপা দশমিনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপর হামলা অব্যাহত। সর্বশেষ চর কাজলের নকুল মন্ডল(৫৫) ও ডাকুয়ার ৭ নং ওয়ার্ডে শেপাল বালা (৩৫)।
এছাড়াও উলানিয়া বন্দরের প্রবীন বিএনপি নেতা ও প্রাক্তন শিক্ষক বাবু হীরন লাল শীলকে তার বাসায় অবরুদ্ধ করে, আশেপাশে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ তোলেন হাসান মামুন।
তিনি দাবি করেন প্রায় সকল এলাকায়ই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সহ বিএনপি নেতাকর্মীরা অব্যাহত হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। হাসান মামুনের ভাষ্যমতে, পটুয়াখালী-৩ আসনে নির্বাচন পরবর্তী এ পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মী আহত ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এদিকে গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গলাচিপা উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মো. আলতাফ খান অভিযোগ করেন, নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে ‘ট্রাক’ প্রতীকের সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতে উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব হোসেন মিয়াকে প্রধান করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কমিটি সকল অভিযোগ তদন্ত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। আহতদের চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়, পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন-এর ‘ঘোড়া’ প্রতীকের সমর্থকরা বিএনপি সমর্থিত নুরের সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়েছে কিন্তু উল্টো হাসান মামুন অপপ্রচার করছে।
এসময় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ইখতিয়ার রহমান কবির বলেন, “নির্বাচনের পরে জোটের প্রার্থী নুরুল হক নুরের ‘ট্রাক’ মার্কা সমর্থন করায় আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মীর ওপর হামলা করা হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, চরবিশ্বাস ইউনিয়নে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নেত্রী পারুল বেগম ও নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে মারধর করা হয়েছে। তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়া হরিদেবপুরে গোলখালী ইউনিয়নে শ্রমিক দলের নেতৃত্বে বিএনপি নেতা শাহজাহান সিকদারের ওপর হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত বিভিন্ন দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক বলে চালানো হচ্ছে তাই প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলেন, “দলীয় পরিচয় নয়, যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, জেলা যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শিপলু খান, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম খান, সদস্য সচিব সাহেব আলীসহ উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতারা। পরে শিপলু খান ও ইখতিয়ার রহমান কবিরসহ বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আহত রোগীদের চিকিৎসার খোঁজ খবর নেন।
অন্যদিকে শনিবার বিকাল সাড়ে ৪ টায়া অফিসার্স ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন গণঅধিকার পরিষদের নেতারা। উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, নুরুল হক নুরের নির্দেশনা হচ্ছে সবাইকে ধৈর্য ধারণ ও শান্ত থাকতে হবে। আমরা একটা সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে চাই। তিনি সবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।
এসময় জেলা যুব অধিকার পরিষদের সহ সভাপতি মহিবুল্লাহ এনিম বলেন, আমখোলা, উলানিয়া, বকুলবাড়িয়া ও চরবিশ্বাসসহ বিভিন্ন জায়গায় পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা পায়ে পাড়া দিয়ে ঝামেলা করছে। তারপরও আমাদের নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছি। আমরা দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে এই জনপদে থাকতে চাই। তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পরাজিত প্রার্থীর নেতাকর্মী সমর্থকরা ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার করছে। অনেকে পারিবারিক দ্বন্দ্ব কলহ রাজনৈতিক হিসেবে টেনে দ্বায় চাপানো হচ্ছে। তবে গণঅধিকার পরিষদের কোন নেতাকর্মীর উপর সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব জাকির হোসেন মুন্সি, শ্রমিক অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক মো. আমীর হোসেন, যুব অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক মো রাসেল মিয়াসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা।
এ বিষয় নুরুল হক নুর ফেইসবুক পোস্টে বলেন, একজন মজলুম মানুষ হিসেবে আমি বরাবরই প্রতিশোধ- প্রতিহিংসা, হানাহানি-মারামারি, সংঘাত-স*হিংসতা, বিদ্বেষের রাজনীতিকে ঘৃণা করে আসছি। গলাচিপা-দশমিনার ট্রাক মার্কার সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষীসহ বিএনপি-গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের প্রতি আমার জোরালো অনুরোধ আপনারা কারো উস্কানির ফাঁদে পড়ে এলাকায় কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ দিবেন না। সর্বোচ্চ ধৈর্য্যের পরিচয় দিন। এখন আমাদের একটাই লক্ষ্য দলমত নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে নির্বাচনী অঙ্গীকারের “ঐক্য, সম্প্রীতি-সমৃদ্ধির নতুন গলাচিপা-দশমিনা” বিনির্মান।
তবে গলাচিপা থানার অফিসার ইনচার্জ জিল্লুর রহমান বলেন, ঘটনার কথা শুনেছি। কিছু ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগ কেউ করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর সংঘাত এড়াতে পুলিশের টহল জোড়দার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত চর কাজলের একটি মামলায় ২জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া দুটি অভিযোগে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।









