মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত জিম্মিদশার কারণে এবছর কৃষকরা ধানের ন্যায্য দাম পায়নি। লোকসান না হলেও লাভের মুখ তেমন বেশি দেখতে পারেননি। তাই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অন্তত পাঁচ হাজার কৃষক কোমর বেধে নেমেছেন বাণিজ্যিকভাবে তরমুজের আবাদে। দিন-রাত তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন মাঠে। কেউ কেউ আগাম আবাদ করা বেড়ে ওঠা তরমুজ গাছের পরিচর্যা করছেন। কেউ বা এখনো ক্ষেত তৈরি করছেন। কেউ বা তরমুজের বীজ রোপণ করছেন। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে শীতকে উপেক্ষা করে কৃষকরা লড়াই করছেন মাঠে তরমুজ ফসল উৎপাদনের জন্য। সরেজমিনে ঘুরে কৃষকের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সংগ্রামী লড়াইয়ের কথা জানা গেছে।
বড় বালিয়াতলী গ্রামের কৃষক ইলিয়াস প্যাদা জানান, এবছর ধানের ভালো দাম পায়নি। তাই পুষিয়ে নেওয়া এবং কিছুটা লাভের আশায় ২৮ বিঘা জমিতে তরমুজের আবাদ করছেন। ১৩ জন কামলা নিয়ে ক্ষেতে বীজ রোপন করছেন। বীজ, সার, কামলা মজুরি নিয়ে ৬-৭ লাখ টাকা খরচ হওয়ার আশঙ্কা তার। ভাগ্য ভালো হলে অন্তত ১৫-২০ লাখ টাকার ফলন পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করলেন ইলিয়াস প্যাদা।
টিয়াখালীর ইটবাড়িয়া গ্রামে বেড়িবাঁধের বাইরে ছয় কানি (৪৮ বিঘা) জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন কৃষক হানজাল গাজী, শাহআলম, জব্বার, লিলি বেগম ও জাহাঙ্গীর হাওলাদার। মাঠে গাছের পরিচর্যা করছিলেন জাহাঙ্গীরসহ কয়েকজনে। জানালেন, কানি প্রতি ৬০ হাজার টাকা দিয়ে তরমুজের আবাদ করছেন। জানালেন জাহাঙ্গীর, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। গাছগুলো বেড়ে উঠেছে। ২০-২২ দিনের মধ্যে ফল ধরবে। কানি জমিতে গড়ে কমপক্ষে তিন লাখ টাকা খরচ হবে ফলন বিক্রি পর্যন্ত। ফলন ঠিকঠাক হলে অন্তত ৫০ লাখ টাকা বিক্রির আশা ব্যক্ত করলেন এই ছয় চাষী।
ইনডেক্স কোম্পানির কাছ থেকে নেওয়া এই জমি পাশাপাশি অন্যান্য চাষীরাও মিলে অন্তত ১৭ কানি জমিতে তরমুজের বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে। কানি জমিতে সাড়ে চার হাজার তরমুজের ফলন হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানালেন এই চাষীরা। তবে এই জমির মধ্যে ১৫-২০ একর খাস জমি আছে বলেও মন্তব্য স্থানীয় বাসীন্দাদের। যা কৃষককে বুঝ দিয়ে একটি চিহ্নিত চক্র টাকাপয়সা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।
ধানখালী ইউনিয়নের ধানখালী গ্রামের কৃষক মিরন মৃধা ও রাজ্জাক আকন এবছর অন্তত কুড়ি কানি (১৬০) বিঘা জমিতে তরমুজের আবাদ করছেন। জানালেন, কানি প্রতি ফলন পাওয়া পর্যন্ত গড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হবে। তবে ভাগ্য সহায় হলে গড়ে কানিতে ৭-৮ লাখ টাকার ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই কৃষকরা আগাম সার কিনে রেখেছেন।
তবে বহু কৃষক সারের বেশি দাম ও সংকটের কথা জানালেন। ধানখালী গ্রামের অধিকাংশ কৃষকের অভিযোগ, তাঁদের স্লুইসটির গেট খুলে একটি মহল মাছ ধরছে। লোনা পানি ওঠা-নামা করছে। তাই এটির গেট এই শুকনোর কয়মাস বন্ধ রাখা দরকার। নইলে সর্বনাশের আশঙ্কা সকলের। এভাবে প্রত্যেকটি ইউনিয়নে শত শত কৃষক এবছরও বাণিজ্যকভাবে তরমুজের আবাদ করছেন। কোমর বেধে লড়ছেন মাঠে। ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজের আবাদ করছেন তারা।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. নাহিদ হাসান জানান, গেল বছর কলাপাড়ায় ৩৩৮০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এবছর এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে আগাম চাষাবাদ করা হয়েছে। এবছর অন্তত ৩৫০০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হবে বলে তার দাবি। ফলন হেক্টর প্রতি অন্তত ৪০ টন পাওয়া যায়। দামও গড়ে কেজি ৩০টাকায় কৃষক পর্যায়ে বিক্রি হয়। তাতে অন্তত ৪২ কোটি টাকার তরমুজের ফলন পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করলেন এই কর্মকর্তা। তিনি এও জানান, সারের মাঠ পর্যায়ে কোন সংকট নেই।









