মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া: কলাপাড়ায় ধান কেনা সিন্ডিকেটের কাছে হাজার হাজার কৃষক পরিবার জিম্মি হয়ে পড়েছে। ধান কাটা, মাড়াই থেকে বিক্রি সব নির্ধারণ করছে সিন্ডিকেট। এমনকি দাম পর্যন্ত। ৪৬-৪৮ কেজিতে মণ দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এলাকার নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের বাইরে দাম-দর করে বিক্রিরও কোন সুযোগ নেই। অন্তত ২০০ টাকা কমে প্রতি মণ ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
এভাবে কৃষককে জিম্মি করে সিন্ডিকেট চক্র মাঝখান দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। কৃষকরা এ নিয়ে প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারছেন না। শতকরা ৮০ শতাংশ কৃষক পরিবার এই মধ্যস্বত্তভোগী সিন্ডিকেট চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। বর্তমানে ৪৬-৪৮ কেজি ওজনের এক মণ ধান (জাত ভেদে) কৃষককে ৯৬০-১১৫০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কৃষকরা এমন দুরাবস্থায় পড়েছেন যে এই সিন্ডিকেটের নাম পর্যন্ত বলতে সাহস পাচ্ছেন না। তাদের ঘামে-শ্রমে উৎপাদিত ধান কাটা-মাড়াই ও কেনাবেচার মধ্য দিয়ে ওই চক্রটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কৃষকরা হতাশা ব্যক্ত করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন। তারা অভিযোগ না দেওয়ায় প্রশাসনও মূলত কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে কৃষকের এমন দুরাবস্থার কথা। বালিয়াতলী ইউনিয়নের বড়-বালিযাতলী গ্রামের এক কৃষক জানান, তিনি ধান কড়ালি, একসনা বন্ধকীসহ বিভিন্নভাবে এবছর পাঁচ কানি (৪০ বিঘা) জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন। অন্তত ৩৫০ মণ ফলন পেয়েছেন। দুই জাতের ধান ৪৬ কেজিতে মণ হিসেবে স্থানীয় নির্দিষ্ট পাইকারের আড়তে গোটা স্বর্ণ ১১ শ’ ও ৪৯ জাতের ধান ১২৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। নির্দিষ্ট আড়ত ছাড়া ধান বেচলে সমস্যায় পড়তে হতো বলে ওই কৃষকের অভিযোগ।
তার মতামত দামদর করে অন্যত্র বেচার সুযোগ থাকলে মণ প্রতি আরো গড়ে দুই শ’ টাকা বেশিতে বিক্রি করতে পারতেন। অপর এক ছোট কৃষক জানালেন, তিনিও নির্দিষ্ট ওই সিন্ডিকেটের আড়তে ১১ শ’ টাকা মণ (৪৬ কেজি) দরে ৪০ মণ ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। বললেন এই কৃষক, ‘জোরজুলুম থেকে রেহাই জুটছে না।’
ধুলাসার ইউনিয়নের অসংখ্য কৃষক জানান, ধান অতিরিক্ত পাঁকার পরে অনেক ঝরে গেছে। কিন্তু কাটা কিংবা মাড়াই ঠিক সময়ে করতে পারেননি। নির্দিষ্ট করা ব্যক্তির ম্যাশিন ছাড়া ধান কাটা-মাড়াই করলে পুলিশি গ্রেফতারের ভয় পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে বলে ভুক্তভোগী কৃষকরা জানিয়েছেন। একই দশা ডালবুগঞ্জ, নীলগঞ্জ, মিঠাগঞ্জ, ধানখালী, চম্পাপুর, মহিপুর ও টিয়াখালী। তবে চাকামইয়ায় এবছর সিন্ডিকেট প্রেশার অনেক কম বলে বহু কৃষক মতামত ব্যক্ত করেন।
অসংখ্য কৃষক নাম প্রকাশ না করার স্বার্থে জানান, একেতো ওজনে মণ প্রতি ৫-৬ কেজি বেশি নেওয়া হচ্ছে। তারপর দামেও অন্তত দুই শ’ টাকা কম। তাঁদের দুরাবস্থার শেষ নেই। কৃষকরা জানান, আট বিঘায় এক কানি জমি। এই এক কানি জমি চাষ করতে ১২ হাজার, রোপণে ১২ হাজার, কীটনাশক-সার ১০ হাজার ও কাটা-মাড়াইতে আরো ১২ হাজার খরচ হয়। ৪৬ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। ফলন পাওয়া যায় গড়ে ৭০-৯০ মণ, তাও সর্বোচ্চ। বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ৯৫ হাজার টাকা। যদি নিজের জমি না থাকে তাইলে এক কানি জমিতে আরো ত্রিশ হাজার টাকা গুনতে হয়। ফলে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীদের অবস্থা শোচনীয় অবস্থায় পৌছেছে।
কৃষকের ভাষায়, তাঁদের মাজা-কোমর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা আরো জানান, কৃষি অফিস থেকে তাঁদের পরামর্শ দেওয়া হয় ছড়ার শতকরা ৮৫ শতাংশ ধান পাকলেই কাটতে হয়। কিন্তু তাঁ পারছেন না। ধান পাঁকার পরে শুকিয়ে ঝরে গেলেও নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের কাছে গিয়ে কাটা ও মাড়াইয়ের সিরিয়াল মেলে না। আর তাঁদের নির্ধারিত দামে বিক্রিতে বাধ্য করার অভিযোগ শতকরা ৮০ শতাংশ কৃষকের। তাদের ভাষ্য সরকার আসে, সরকার যায়, তাঁদের জিম্মিদশার অবসান ঘটছে না। কৃষকরা মুখ না খোলায় প্রশাসনও অনেক সময় কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।
তবে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ধানের পাইকারি ক্রেতা মোঃ হারুন মিয়া জানান, ধান তাঁরা ছোট (৪০ কেজি) আবার বড় (৪৬ কেজিতে) কেনেন। কৃষকরা যেভাবে চায়। তবে অন্য ইউনিয়নে বড় মাপে চলে বলেও তার দাবি। এছাড়া দাম ছোট মণে ৯২০ আবার বড় মাপে ১০৭০ পর্যন্ত বিক্রি হয়। জাত ভিন্ন হলে দামও কমবেশি আছে।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন জানান, বিষয়টি তাঁরা অনেকটাই জানেন। কিন্তু কৃষকরা সরাসরি কোন অভিযোগ করছে না। তারপরও বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করবেন।
কলাপাড়া খাদ্য গুদাম ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, এবছর সরকারিভাবে ৩৪ টাকা কেজি দরে ধান কেনার কলাপাড়ায় লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ২৩১ টন। তাতে ৪৬ কেজির মণ দাম পড়ছে ১৪৬৪ টাকা। অথচ কৃষকরা এবছর কমপক্ষে ৭০ হাজার মেট্রিক টন ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন ৯৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা মণ দরে। যাতে কৃষকের হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কমপক্ষে ৩৫ কোটি টাকা।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, তিনি মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন করে বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবেন।









