নাছিম উল আলম: সাদা মাছির আক্রমনে বরিশাল সহ উপক্থলীয় অঞ্চলের প্রায় এক কোটি নারকেল গাছের ফলন বিপর্যয় ঘটেছে। গত প্রায় বছরখানেক ধরে বরিশাল অঞ্চল যুড়ে নারকেল ছাড়াও পেয়ারা সহ বিভিন্ন মৌসুমী ফলের গাছে সাদা মাছির আক্রমনে ফলন বিপর্যয় অব্যাহত রয়েছে। তবে নারকেল গাছেই এর আক্রমন তুলনামূলকভাবে বেশী ও মারাত্মক আকার ধারন করেছে। এসব মাছিপোকা গাছের পাতার নিচে অবস্থান নিয়ে রস খেয়ে ফেলে। ফলে পানি শূণ্যতায় গাছ দূর্বল হয়ে ফলন বিপর্যয় ঘটছে। গাছের উচ্চতায় পাতার নিচে মাছির আক্রমন হয় বিধায় সাধারন স্প্রে মেশিন দিয়ে সেখানে বালাই নাশক প্রয়োগ সম্ভব হয়না বিধায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এসব মাছি তাড়াবার বা মেরে ফেলারও কোন উপায় থাকছে না। শুধুমাত্র ফুট-স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে কীটনাশক প্রয়োগ করলেই এসব মাছি নির্মূল সম্ভব। কিন্তু সাধারন কৃষকদের কাছে সে ধরনের স্প্রে-মেশিন না থাকায় খুব সহসা এসব মাছির আক্রমন থেকে গাছ রক্ষা দুরুহ হয়ে পড়ায় নারকেলের উৎপাদন ক্রমশ তলানীতে পৌছছে। ফলে ডাব ও নারকেলের দামও আকাশ ছোয়া।
ডাব ও নারকেলের প্রধান উৎপাদনস্থল বরিশালের বাজারে একটি ছোট ডাবের দামও এখন ১২৫ টাকা। ছোট নারকেলের জোড়া বিক্রী হচ্ছে প্রায় ৩শ টাকা। ফলে এবার ‘ডেঙ্গুর হটস্পট’ বরিশালের রোগীদের দূর্ভোগ আরো চরমে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ডাবের পানি একটি উপকারী পানীয় হলেও আকাশছোঁয়া দামের কারণে বেশীরভাগ রোগীর পক্ষেই তা পান করা ‘কল্পনা বিলাস’এ পরিনত হয়েছে।
এ ব্যপারে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর-ডিএই’র বরিশাল অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী ও অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরল ইসলাম সিকদারের সাথে আলাপ করা হলে তিনি জানান, সম্প্রতিককালে নারকেল সহ বিভিন্ন ফলের গাছে সাদা মাছি পোকার আক্রমন অনেকটাই বাড়ছে। আমরা যেখানেই খবর পাচ্ছি, সেখানেই লোক পাঠাচ্ছি। আমাদের ফুট পাম্প দিয়ে আক্রান্ত গাছগুলোতে কীটনাশক স্প্রে করে পোকা তাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদকদের নানা ধরনের পরামর্শও প্রদান করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মাছি পোকার আক্রমনে উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় গত বছরখানেক ধরে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল যুড়েই ভয়াবহ আকারে অত্যাবশ্যকীয় এ পানীয় ও তেলজাতীয় ফল ফসলের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমনকি এ অঞ্চলের নারকেলের ওপর নির্ভর করে ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা শতাধিক তেল তৈরীর ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পও বন্ধের পথে। যার অনেকগুলোই এসএমই সহ নানা ধরনের ব্যাংক ঋন নিয়ে গড়ে উঠেছিল। তাদের এখন মাথায় হাত। এমনকি নারকেলের সাথে তেলের উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। ফলে নারকেল তেলের দামও বাড়ছে।
বৈজ্ঞানিক ‘কোকোস নিউসিফেরা’ নামের এ গাছের ইংরেজী নাম কোকোনাট। যা আমাদের দেশে নারকেল নামে অভিহিত। ভারতে যাকে নারকোল নামেও ডাকা হয়।
প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপ নারকেলের আবাসভ্থমী। বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলংকা, ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীন, ফিলিপিনস মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাপুয়া নিউগিনি, ওশেনিয়া, আফ্রিকা মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা সহ পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জেও কম-বেশী নারকেল জন্মে। পরিমিত ক্ষারত্ব,অম্লত্ব ও লবনাক্ততা সহিষ্ণু এ গাছ উপক্থলের বালুময় অঞ্চল থেকে ৬শ মিটার পর্যন্ত উচ্চতার পাহাড়ী ভ্থমীতে নারকেল গাছ জন্মে। পানি নিস্কাসনের সুবিধাযুক্ত দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি নারকেল চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। এমনকি নারকেল পামি পরিবারভ্থক্ত শাখা প্রশাখা বিহীন এক বজপত্রী চির সবুজ উদ্ভিদ। এ গাছের কান্ড শক্ত, গোলাকার, সোজা ও লম্বা। একটি সুস্থ সবল নারকেল গাছ ১৫-২০ মিটার পর্যন্ত উচু হতে পারে। এমনকি নারকেল উভলিঙ্গ গাছ। যে গাছে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদাভাবে জন্মে।
‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট-বারি’র মতে দেশে প্রায় ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বছরে ডাবের উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ টন। যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের উৎপাদনই বরিশাল সহ সন্নিহিত উপক্থল অঞ্চলে । নারেকেলের শাঁসে প্রচুর স্নেহ জাতীয় পদার্থের পাশপাশি ডাবের পানিতে যথেষ্ঠ পরিমানে প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ বিদ্যমান। ফলে খাবার স্যালাইনের বিকল্প হিসেবেও ডাবের পানি অত্যন্ত কার্যকর বলে চিকিৎসকগন মনে করেন।
পাশাপাশি নারকেলের শাঁসে প্রচুর তেল রয়েছে। আমাদের কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে দেশীয় জার্ম প্লাজাম দিয়ে ‘বারি নারিকেল-১’ এবং বিদেশী থেকে প্রবর্তিত ‘বারি নারিকেল-২’ নামে দুটি উন্নতমানের ও উচ্চ ফলনশীল নারিকেলের জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাতের গাছে সারা বছরই ফল ধরে। একাটি পূর্ণ বয়স্ক গাছে বছরের ৬৫-৭৫টি পর্যন্ত নারকেল ধরে। যার পরিপক্ক শাসে তেলের পরিমান ৫৫-৬০% পর্যন্ত। গবেষকদের মতে, ‘বারি নারিকেল-১’ সারাদেশে এবং ‘বারি নারিকেল-২’ সারা দেশের মত বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলে আবাদের বেশী উপযোগী।
তবে বরিশাল সহ সন্নিহিত উপক্থলীয় অঞ্চলে নারকেল গাছের সংখ্যা সহ সঠিক পারিসংখ্যান না থাকলেও শুধুমাত্র ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে বন অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর ও বিএডিসি প্রায় ১ কোটি নারকেল চারা উত্তোলন করে বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলে বিনামূল্যে বিতরণ করেছিল।








