উপকূলের মানুষের সুখ-দুঃখ, সংকট, সম্ভাবনা ও অধিকার নিয়ে যিনি দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কলম ধরেছেন, সেই সাংবাদিক সোহরাব হোসেন আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে পটুয়াখালীর সাংবাদিকতা অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘ ২২ বছরের সাংবাদিকতা জীবনের ইতি টেনে প্রিয় জন্মভূমির মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে পটুয়াখালীর আউলিয়াপুরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে সকাল ১০টায় আউলিয়াপুর সাবিনা আক্তার মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, পেশাজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
জানাজায় উপস্থিত মুসল্লিদের কাছে বাবার জন্য দোয়া চান সোহরাব হোসেনের বড় ছেলে আতিকুর রহমান ও ছোট ছেলে সুফিয়ান মোল্লা। এ সময় উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। জানাজা শেষে তাঁর বড় ভাই মাওলানা ওহাব মোল্লার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
সহকর্মীদের শ্রদ্ধা, শোকাহত সাংবাদিক সমাজ
সাংবাদিক সোহরাব হোসেনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দ্য ডেইলি স্টারের কনটেন্ট এডিটর মোহাম্মদ আল-আমিন, পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি জাকির হোসেনসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
এ সময় তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। প্রিয় সহকর্মীকে হারিয়ে শোক প্রকাশ করেন উপস্থিত সাংবাদিক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সোহরাব হোসেন। হাসপাতালের মৃত্যু সনদে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২২ বছরের সাংবাদিকতায় উপকূলের মানুষের কণ্ঠস্বর
সোহরাব হোসেন ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি দেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এ যোগ দেন। এরপর দীর্ঘ ২২ বছরেরও বেশি সময় ধরে পটুয়াখালী জেলার নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
দীর্ঘ এই কর্মজীবনে তাঁর প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে উপকূলীয় জনপদের মানুষের জীবনসংগ্রাম, দুর্ভোগ ও অধিকারবঞ্চনার চিত্র। স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, পরিবেশ, অবকাঠামো, উন্নয়ন প্রকল্প এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার নানা সংকট নিয়ে অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন তিনি।
পটুয়াখালী ইপিজেডের জন্য জমি অধিগ্রহণে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকসংকট এবং বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকা সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে ১৪০টি ডলফিনের মৃত্যুর ঘটনা, জেলেদের দুর্দশা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে নদীভাঙন ও ভাঙনের প্রভাব নিয়েও প্রতিবেদন করেছেন তিনি।
সম্প্রতি পায়রা বন্দরে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ সত্ত্বেও এর সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না হওয়া নিয়ে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও অবদান রাখেন সোহরাব হোসেন।
তাঁর এসব প্রতিবেদন উপকূলীয় অঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতি
দীর্ঘদিন ধরে পেশাদারত্ব, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সাংবাদিকতা করার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে দ্য ডেইলি স্টার-এর সেরা জেলা প্রতিবেদকের পুরস্কার অর্জন করেন সোহরাব হোসেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন তিনি। পটুয়াখালী প্রেসক্লাবের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও সামলেছেন তিনি।
পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাংবাদিকদের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
শোক প্রকাশ দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদকের
সোহরাব হোসেনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন দ্য ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং সোহরাব হোসেনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে উপকূলের মানুষের সমস্যা, সম্ভাবনা ও অধিকার নিয়ে কাজ করা এই সাংবাদিকের মৃত্যুতে তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা একজন প্রিয় মানুষকে হারালেন।
সোহরাব হোসেনের মৃত্যুতে তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অবসান ঘটলেও উপকূলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, দুর্ভোগ ও সম্ভাবনার যে চিত্র তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, তা তাঁর কর্মের স্মারক হয়ে থাকবে।
আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দান করুন। আমিন।








