গাজায় কবরের জায়গাও ফুরিয়ে গেছে, দাদার কবরে বাবাকে দাফন!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, ব্যাপক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহতায় এবার মৃতদের দাফনের জায়গাও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। ইসরাইলি হামলায় বহু কবরস্থান ধ্বংস হওয়া এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণে স্বজনদের দাফন করতে গিয়ে পরিবারগুলোকে পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহার, অস্থায়ী কবর তৈরি কিংবা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই মরদেহ সমাহিত করার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় গত ১০ জুন ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে গুলিতে নিহত হন ৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-সাওহি। তাঁর ছেলে ওমর আল-সাওহি বাবাকে দাফন করতে জেইতুন কবরস্থানে গেলে দেখতে পান, নতুন কবর তৈরির মতো প্রায় কোনো জায়গাই অবশিষ্ট নেই।
যুদ্ধের মধ্যে কবরগুলো এত ঘন হয়ে গেছে যে অনেক কবরের স্থায়ী কোনো চিহ্নও নেই। কোথাও একটি পাথর কিংবা কাগজে মৃত ব্যক্তির নাম লিখে রাখা হয়েছে। অনেক মরদেহ বালুর নিচে দাফন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
ওমরের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নতুন কবর তৈরিতে প্রায় ৫০০ শেকেল বা ১৬৭ ডলার প্রয়োজন হলেও সেই অর্থ জোগাড় করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। জায়গার সংকটও ছিল প্রকট। শেষ পর্যন্ত বাবাকে তাঁর দাদার কবরে দাফন করতে বাধ্য হন তিনি।
ধ্বংসস্তূপেও হচ্ছে দাফন
যুদ্ধের কারণে গাজার হাসপাতাল, পৌরসভা ও অন্যান্য নাগরিক সেবা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলমান হামলার ঝুঁকির কারণে অনেক মরদেহ সময়মতো উদ্ধার ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বহু মানুষ দীর্ঘ সময় নিখোঁজ হিসেবেও তালিকাভুক্ত ছিলেন।
যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়ির আঙিনা, তাঁবু, আশ্রয়শিবির, স্কুল ও হাসপাতালের প্রাঙ্গণেও অস্থায়ীভাবে মরদেহ দাফন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পর হামলার মাত্রা কিছুটা কমলে অনেক পরিবার এসব অস্থায়ী কবর ও ধ্বংসস্তূপ থেকে স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করে পুনরায় দাফনের উদ্যোগ নেয়।
গাজার কর্তৃপক্ষের দাবি, যুদ্ধবিরতির পরও অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের জন্য নতুন করে দাফনের জায়গা প্রয়োজন হয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোর প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ধ্বংস হয়েছে ৪০টির বেশি কবরস্থান
দাফনের জায়গার সংকটের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কবরস্থান ধ্বংস। গাজার ধর্মীয় ও ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে।
ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে কবরস্থানে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় অনেক পরিবার স্বজনদের দাফন করতেও সমস্যায় পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে আগে কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত কিছু এলাকাও এখন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কবরের ফলক ও নির্মাণসামগ্রীর সংকটে বেড়েছে দাফনের খরচও।
গাজার কর্তৃপক্ষের হিসাবে, বর্তমানে একটি মরদেহ দাফনে ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলার পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। স্থায়ী ফলক তৈরি করতে না পেরে অনেকেই ধ্বংস হওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা ঢেউটিন দিয়ে কবর চিহ্নিত করছেন।
৬০ কবর থেকে প্রায় ৬ হাজার!
খান ইউনিসের একটি কবরস্থানের কর্মী তাফেশ যুদ্ধের ভয়াবহতার আরেকটি নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে ওই কবরস্থানে ছিল প্রায় ৬০টি কবর। এখন সেখানে কবরের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজারে।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে তাঁকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি নতুন কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও নবজাতকও রয়েছে।
কখনো কোনো বাড়ি, গাড়ি কিংবা তাঁবু ইসরাইলি হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হলে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মরদেহ একসঙ্গে কবরস্থানে নিয়ে আসা হয়েছে।
গাজার বর্তমান বাস্তবতায় তাই যুদ্ধের ভয়াবহতা শুধু জীবিত মানুষের ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই—মৃত স্বজনের জন্য একটি নিরাপদ কবরের জায়গা পাওয়াও এখন বহু পরিবারের কাছে এক নির্মম সংগ্রাম।


