২০২০ সালে করোনা মহামারি যখন শুরু হয় বিশ্বের কোন দেশের জনগণের পক্ষেই ঠাহর করা সম্ভব হয়নি সামাজিক নৈকট্য এই রোগ বিস্তারের প্রধান মাধ্যম হতে পারে! পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে গিয়েছিল এই রোগ এর প্রাদুর্ভাবের ধরন দেখে।
২০০০ সালে একজন সংবাদ পাঠক নির্দিষ্ট দিনের সংবাদের জন্য পরবর্তী দিনের অর্ধভাগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতো কখন পত্রিকা তার ঘরের দোরগোড়ায় পৌছাবে। তখনকার সময়ে একজন পাঠক কল্পনায় আনতে পারতো না ঘরে বসে সরাসরি নিত্যদিনের ঘটনাপ্রবাহ দেখতে পাবে।
তেমনিভাবে, ২০৮০ সালে কলাপাড়া উপজেলার যদি একটি কাল্পনিক চিত্র ভাবা হয় যেখানে বর্তমান কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট সমুদ্র গহ্বরে থাকবে, এ ধারণা যে মোটেই অলিক নয় তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় জাতিসংঘ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইপিসিসি (IPCC) সহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ও দেশী সংস্থার রিপোর্টে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০৮০ সাল নাগাদ পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হতে পারে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক ডেটা ও প্রক্ষেপণ (Projection) বিশ্লেষণ করে এই ভয়াবহ পূর্বাভাসের কথা জানা গেছে।
গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রের জলস্তর যেভাবে বাড়ছে, তাতে কলাপাড়ার মতো নিম্নাঞ্চলগুলো শতাব্দীর শেষভাগে এসে স্থায়ীভাবে সাগরের পেটে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থার আশঙ্কাজনক ডেটা:
জাতিসংঘের মতে, ২০৫০ সালে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ৩ ফুট।বাংলাদেশের উপকূলবর্তী ভূমি ডুবে যাবে ১৭%।বাংলাদেশে জলবায়ু শরনার্থী হবে ৩ কোটি।
আইপিসিসি (IPCC) ও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাংকের ঝুঁকির তালিকায় ১ নাম্বারে বাংলাদেশ।
আইপিসিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর শেষভাগের আগেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ডেটা বলছে, ১ মিটার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ এলাকা স্থায়ীভাবে তলিয়ে যাবে, যার ফলে সারা দেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ ‘জলবায়ু শরণার্থী’তে পরিণত হবে। কলাপাড়া উপজেলা এই ঝুঁকিপূর্ণ জোনের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত।
আইসিসিএডি (ICCCAD) ও বুয়েটের গবেষণা: ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ICCCAD) এবং বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট (IWFM)-এর তথ্যমতে, বঙ্গোপসাগরে জলস্তর বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় ২ থেকে ৫ গুণ বেশি (বছরে প্রায় ৬ থেকে ২০ মিলিমিটার)। এই গতি সচল থাকলে ২০৫০ থেকে ২০৮০ সালের মধ্যে কলাপাড়ার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, চরাঞ্চল এবং লোকালয় স্থায়ী লবণাক্ততা ও প্লাবনের শিকার হবে।
আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়ন (AGU): সংস্থাটির একটি সিমুলেশন মডেল দেখাচ্ছে যে, সমুদ্রের স্তর বৃদ্ধির ফলে কলাপাড়াসহ দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে যে বাস্তুচ্যুতির ধাক্কা তৈরি হবে, তা পুরো দেশের অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের ওপর এক বিশাল চেইন-অ্যাকশন বা ক্যাসকেডিং প্রভাব ফেলবে।
কেন কলাপাড়া সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কলাপাড়া সরাসরি বঙ্গোপসাগরের মুখোমুখি। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তিনটি প্রধান কারণে এখানকার মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে:
১. স্থায়ী প্লাবন: জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বেড়ে যাওয়া।
২. তীব্র লবণাক্ততা: মাটিতে ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ায় ২০৮০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলে কৃষি এবং সুপেয় পানির কোনো উৎস অবশিষ্ট থাকবে না।
৩. ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাস: সাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সুপার-সাইক্লোন এবং জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা পোল্ডার বা বেড়িবাঁধ দিয়ে ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি:
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৮০ সাল দূরবর্তী মনে হলেও এর প্রভাব এখনই শুরু হয়ে গেছে। কলাপাড়ার অনেক মানুষ ইতোমধ্যে জীবিকার তাগিদে ঢাকা বা অন্য বড় শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। যদি এখনই আন্তর্জাতিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো না যায় এবং স্থানীয়ভাবে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অভিযোজন (Adaptation) প্রকল্প গড়ে তোলা না হয়, তবে ২০৮০ সাল নাগাদ কলাপাড়া মানচিত্র থেকে আংশিক বিলীন হয়ে ইতিহাসের বৃহত্তম মানব বাস্তুচ্যুতির সাক্ষী হতে পারে।
তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনই সমন্বিত জলবায়ু তহবিল গঠন এবং বাস্তুচ্যুত হতে যাওয়া মানুষদের জন্য পুনর্বাসন পরিকল্পনা বা ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট আরবানাইজেশন’ শুরু করা জরুরি।









